কক্সবাজারের ইনানীতে ‘টুপটুপ রেসটো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের একজন সাভারের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯)। তার মৃত্যুর খবরে সাভারে স্বজন, পরিচিতজন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আদর্শ শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন নাসরিন। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
বিজ্ঞাপন
পড়াশোনা শেষ করে নাসরিন সাভারের আশুলিয়া থানার নিরিবিলি এলাকায় অবস্থিত ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বপ্নবিলাস ইউনাইটেড স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের প্রিয় শিক্ষিকা হয়ে ওঠেন তিনি।
নাসরিন সাভার ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি এবং সাভার মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (নিটার) থেকে স্নাতক এবং গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
দীর্ঘদিনের পরিচিত ও ভালোবাসার মানুষ ফয়সাল দেওয়ানের সঙ্গে ছয় বছর আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নাসরিন। স্বামী ফয়সাল দেওয়ান জানান, ঘুরে বেড়ানো ছিল নাসরিনের অন্যতম শখ। অনেক দিন ধরেই বান্ধবীদের সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে তা হয়ে উঠছিল না। এবারের দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই তিন বান্ধবী মিলে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দভ্রমণই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় মর্মান্তিক ঘটনায়।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার ওই রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় নাসরিনের দুই বান্ধবী আইরিন জাহান মীম ও ইমা প্রাণে বেঁচে গেলেও আকস্মিক ঘটনায় তাঁরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।
জানা গেছে, ঘটনার সময় তারা দুজন রিসোর্টের কক্ষ থেকে বেরিয়ে কয়েক গজ দূরে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এমন সময় বিকট শব্দে আগুন জ্বলে ওঠে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আগুনের ভয়াবহতা দেখে তাঁরা কয়েকবার জোরে ডেকে প্রিয় বান্ধবী নাসরিনকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়া ছাড়া তাঁদের আর কিছুই করার ছিল না।
নিহত নাসরিনের বাবা মোস্তফা কামাল সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার। তার মা নাছিমা আক্তার খুশী। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে নাসরিন ছিলেন বড়।
শনিবার বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে মুঠোফোনে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন নাসরিন। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো আর ঘুরে বেড়ানোর ছোট ছোট ইচ্ছা নিয়েই এগিয়ে চলছিল তার জীবন। কিন্তু ইনানীর সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে থেমে গেল তার পথচলা। অপূর্ণ থেকে গেল আদর্শ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন।
