জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব ও বিভিন্ন সেবার সীমাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা। ৪২ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও জনবল কম থাকায় প্রতিদিন রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, সিজারিয়ান অপারেশন, আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠায় বাড়ছে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ।স্থানীয়দের অভিযোগ, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার আটটি ইউনিয়নে কমিউনিটি পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে রোগীদের অন্যত্র যেতে হচ্ছে।
সিজারিয়ান সেবা না থাকায় বিপাকে গর্ভবতী মায়েরা, হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা থাকলেও জটিলতার কারণে যেসব গর্ভবতী নারীর সিজারিয়ান অপারেশন প্রয়োজন হয়, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে জরুরি প্রয়োজনে অনেক গর্ভবতী নারীকে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জামালপুর জেলা শহরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের সিজারিয়ান সেবা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছুদিন আগে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সায়মুন শাহারিয়াকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় সার্জন না থাকায় সেখানে অপারেশন হতো না। ফলে তাঁর দায়িত্ব পালনের সুযোগও সীমিত ছিল।এদিকে, পাশের ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা থাকলেও দেওয়ানগঞ্জে কেন এ সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় সার্জন, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক, অপারেশন থিয়েটার ও সহায়ক ব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করে দ্রুত সিজারিয়ান সেবা চালু করতে হবে।আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও মিলছে না সেবা, হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও সোনোলজিস্টের অভাবে নিয়মিত পরীক্ষা করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগীদের বাড়তি টাকা খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আলট্রাসনোগ্রাম করাতে হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সেবা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি জনবল নিয়োগ করা হলে সরকারি ব্যবস্থায় কম খরচে রোগীরা এ সেবা পেতে পারতেন।
এক্স-রে সেবা নিয়েও অসন্তোষ, হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রোগীদের। অনেক সময় এক্স-রে করার পর মোবাইল ফোনে ছবি তুলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। পাশাপাশি এক্স-রে ফিল্মের সংকটে নিয়মিত সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। এ পরিস্থিতিতে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি পরীক্ষা করানোর জন্য মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের মাধ্যমে যেতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
জরুরি বিভাগে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও নানা সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত কিংবা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেক সময় জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের।
অভিযোগ রয়েছে, জরুরি বিভাগে দিন-রাত তিন শিফটে সেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সীমিতসংখ্যক কর্মী দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অনেক সময় অন-কল চিকিৎসক ডেকে এনে রোগী দেখানোর প্রয়োজন হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।স্থানীয়দের আশঙ্কা, জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হলে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হতে পারে। তাই জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।অন্তর্বিভাগের সেবা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ, হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে ভর্তি রোগীদের সময়মতো ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সেবা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিছু নার্সের বিরুদ্ধে। রোগীদের স্বজনদের দাবি, দায়িত্ব পালনকালে কিছু নার্স মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। এ বিষয়ে কিছু বললে রোগী বা তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
এ ছাড়া হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করে রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স ও অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।সমস্যা স্বীকার করলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসান হাবিবের সঙ্গে কথা হলে তিনি চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে এখানে কর্মরত। দেওয়ানগঞ্জকে আমি আমার শেকড় মনে করি। আমাদের এখানে অনেক সমস্যা রয়েছে, তা আমরা স্বীকার করি। চিকিৎসক সংকট শুধু দেওয়ানগঞ্জের সমস্যা নয়, এটি সারা দেশের সমস্যা।”
তিনি আরও বলেন, কয়েক মাস আগে আটজন চিকিৎসক যোগ দিলেও তাঁদের মধ্যে দুজন এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এ ছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বদলিজনিত কারণেও সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, এলাকার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে হাসপাতালের সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন এবং দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি, দেওয়ানগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, শুধু শয্যাসংখ্যা বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে।এ অবস্থায় দেওয়ানগঞ্জবাসী স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে মন্ত্রী দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবেন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।স্থানীয়দের দাবি, চিকিৎসক সংকট নিরসন, সিজারিয়ান অপারেশন চালু, আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে সেবা সচল, জরুরি বিভাগে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত এবং হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হোক। তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষ নিজ উপজেলাতেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং সময় ও অর্থের অপচয় কমবে।
The post দেওয়ানগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা appeared first on ভোরের চেতনা.
