গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগআলী এলাকায় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ইউনিট-২ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে ফায়ার সার্ভিস। আগুনের তীব্রতা বাড়ার পেছনে কারখানায় থাকা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক এবং অ্যালুমিনিয়াম পেপারের নিচে ব্যবহৃত দাহ্য রাবারকে দায়ী করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে উদ্ধার ও তল্লাশি কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
গতকাল বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে টঙ্গীর চেরাগআলী স্কুইব রোডে অবস্থিত কারখানাটির একটি ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পরে আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় আশপাশের বিভিন্ন স্টেশন থেকে পর্যায়ক্রমে ইউনিট যুক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুনায়েদ আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, কারখানার একটি পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। ভবনটির সঙ্গে সিঁড়ির মাধ্যমে পাশের আরেকটি ভবনের সংযোগ থাকায় আগুন সেখানে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পাশাপাশি থাকা দুটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানান, কারখানার ভবনে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছিল। এ ছাড়া অ্যালুমিনিয়াম পেপারের নিচে ব্যবহৃত রাবার অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের ভেতরে রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির কারণে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখার পরই আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার সময় ভবনের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বিস্ফোরণের মতো শব্দ ও আগুন দেখা যায়। রাসায়নিক পদার্থের কারণে সেখানে ক্লোরিনের ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মীর শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে তাঁকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেগুলো পুরোপুরি নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও নির্বাপণ ও ড্যাম্পিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর কেমিক্যাল ডেঞ্জার ইউনিট এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মেডিকেল টিম ও রোবট সহায়তা করছে। কারখানার কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরাও উদ্ধার ও আগুন নেভানোর কাজে সহযোগিতা করেছেন। আগুন যাতে আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও শুরু থেকে সতর্ক ছিল সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানান, সমন্বিত প্রচেষ্টায় আগুনের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আশপাশের স্থাপনা সুরক্ষিত রাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কারখানার ভেতরে আগুনের উৎস শনাক্ত করা এবং বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার ফাইটারদের প্রচণ্ড তাপ ও ঘন ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। রাসায়নিকের ঝাঁঝালো গন্ধও তাঁদের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। প্রয়োজনীয় শ্বাস-প্রশ্বাসের সরঞ্জাম ব্যবহার করে কর্মীরা উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চালিয়ে যান।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, যে ভবনে প্রথম আগুন লাগে, সেটির চতুর্থ ও দ্বিতীয় তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটির অন্য তলাগুলোতেও উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশের আরেকটি ভবনও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারখানাটিতে পাউডার, ইনজেকশনসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি হতো।
আগুনে ওষুধ, উৎপাদনের কাঁচামাল এবং যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কারখানাটিতে প্রায় ৩৮৫ জন শ্রমিক কাজ করেন বলে শিল্পাঞ্চল পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগুন লাগার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রথমে নিজেরা আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। কারখানার ভেতরে কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রথম দিকে অনিশ্চয়তা ছিল।
পরবর্তী সময়ে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের কথা জানানো হয়। তবে তল্লাশি কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এবং এতে মোট কত টাকার ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। অগ্নিনির্বাপণ ও তল্লাশি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বিআলো/অর্নব