বাংলাদেশের আর্থিক খাতের হৃৎপিণ্ড বলা হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। সেই হৃৎপিণ্ডের ডিজিটাল জানালা, অর্থাৎ অফিসিয়াল ওয়েবসাইটটি (bb.org.bd) গত বুধবার রাত থেকে বন্ধ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে গেলে শুধুমাত্র “সার্ভিস আনঅ্যাভেইলেবল” বার্তাটি দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইটটি সাময়িকভাবে অফলাইনে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পেছনে কারণ কোনো দেশীয় হ্যাকিং নয়, বরং একটি বৈশ্বিক কারিগরি ত্রুটি। বিশ্বব্যাপী ওয়েবসাইট পরিচালনার অন্যতম প্রধান প্রোগ্রামিং ভাষা PHP-তে একটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি (CVE-2024-55999) শনাক্ত হয়েছে। এই ত্রুটিকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা রিমোট কোড এক্সিকিউশনের মাধ্যমে সার্ভারে প্রবেশ করে পুরো সিস্টেম দখল করতে পারে। ঝুঁকি আঁচ করতে পেরে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, ফ্রান্সের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ANSSI, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বহু দেশের সরকারি ওয়েবসাইটও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফরাসি সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি ছিল একটি জরুরি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক একা নয়, পুরো বিশ্বই এখন একই আতঙ্কে ভুগছে।
প্রশ্ন উঠছে, একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করা কতটা গুরুতর? সাধারণ মানুষের কাছে ওয়েবসাইট মানে শুধু নোটিশ দেখা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট মানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংক্রান্ত তথ্য, মুদ্রানীতি, আমদানি-রপ্তানির সার্কুলার, ব্যাংকগুলোর জন্য নির্দেশনা, ডলারের দর। এই সাইট বন্ধ থাকা মানে আর্থিক ব্যবস্থার তথ্য প্রবাহ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়া। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে, অভ্যন্তরীণ লেনদেন, SWIFT এবং আন্তঃব্যাংক কার্যক্রম সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও স্বাভাবিক আছে। গ্রাহকের জমা করা টাকার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
এই ঘটনা আমাদের ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির সেই কালো রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ লাজারাস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি, এখনো সেই টাকা পুরোপুরি ফেরত আসেনি। সেই ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তার সাইবার নিরাপত্তায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, একটি পূর্ণাঙ্গ সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠন করেছে, বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে। তাহলে আজ আবার কেন এই পিছু হটা? এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে আসাটাই স্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত এবং এটাই পরিপক্কতার লক্ষণ। সাইবার নিরাপত্তায় দুটি ধারণা আছে, একটি হলো Reactive, অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া, আরেকটি হলো Proactive, অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়ার আগেই ঝুঁকি বন্ধ করা। ২০১৬ সালে আমরা Reactive ছিলাম, আক্রান্ত হওয়ার পর টের পেয়েছিলাম। এবার আমরা Proactive। ঝুঁকিপূর্ণ PHP ভার্সন আপডেট না হওয়া পর্যন্ত সাইট অফলাইনে রাখা, এটা দুর্বলতা নয়, বরং দায়িত্বশীলতার পরিচয়। আক্রান্ত হওয়ার আগে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া — এটাই আধুনিক সাইবার নিরাপত্তার প্রথম পাঠ। ওয়েবসাইট বন্ধ করা মানে হার মানা নয়, বরং যুদ্ধের আগে ঢাল তুলে ধরা।
তবে উদ্বেগের জায়গা অন্য। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার, এমনকি স্বাস্থ্য খাতের ডাটাবেজও অতীতে একাধিকবার সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। গত বছর বহু নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, আমাদের Critical Information Infrastructure (CII) কতটা সুরক্ষিত? শুধু একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করাই কি সমাধান, নাকি পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সাইবার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম দরকার? আজ বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ করেছে, কাল যদি কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক আক্রান্ত হয়?
সরকারের উচিত এই ঘটনাকে একটি Wake-up Call হিসেবে নেওয়া। তিনটি কাজ এখনই জরুরি। প্রথম, সকল সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও সার্ভারের জন্য বাধ্যতামূলক সাইবার অডিট এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্যাচ আপডেট নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়, একটি জাতীয় সাইবার হুমকি গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, BGD e-GOV CIRT এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রিয়েল-টাইমে তথ্য শেয়ার করবে। তৃতীয়, জনগণকে সচেতন করা, যাতে গুজবে কেউ বিভ্রান্ত না হয় যে ব্যাংকের টাকা আটকে গেছে। কারণ, ওয়েবসাইট বন্ধ মানেই ব্যাংক বন্ধ নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শেষ হলেই সাইট আবার চালু হবে। আমরা আশা করব, এই সাময়িক অন্ধকার দ্রুত কেটে যাবে। কিন্তু এই অন্ধকার আমাদের শিখিয়ে গেল, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু ফাইবার অপটিক আর অ্যাপ বানালেই হবে না, তার সুরক্ষার জন্য একটি লোহার প্রাচীরও বানাতে হবে। নইলে এক ক্লিকেই সব আলো নিভে যেতে পারে। প্রযুক্তি যত এগোবে, নিরাপত্তার লড়াই তত কঠিন হবে — এই সত্যটাই আজকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রচিন্তক
