রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ২৪ বছর বয়সী মো. সাগর নিহত হয়েছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। মৃত্যুর আগে মাকে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘মা, তোমাকে অনেক মিস করি মা।’ গত শনিবার রাশিয়ায় থাকা সাগরের এক বন্ধু তাঁর বোনের মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে মৃত্যুর খবর জানান।
নিহত সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার মৃত্যুর খবরে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মাকে পাঠানো ভিডিও বার্তায় সাগর বলেন, ‘মা, তোমাকে অনেক মিস করি মা। তোমার ছবিটা দেখলে আমার কান্না আসে মা। তুমি খালি দোয়া করো মা আমার লাইগা।’
ভিডিওতে তিনি আরও বলেন, ‘মা, এক বছর সময়, দুই মাস তিন মাস গেছে মা। যদি আমি না আসি, তাইলে গায়েবি জানাজা দিয়া দিও মা। আর যদি আল্লাহ ফিরাইয়া আনে, তাইলে তো তোমার কোলে যাইয়া ফিরমু মা। আলহামদুলিল্লাহ মা, দোয়া করো আমার লাইগা, সবাই দেইখা খেয়াল রাইখো মা।’
যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বর্ণনা করে সাগর বলেন, ‘এখানে ইন্টারনেট নাই, মানুষের বুক-পিঠ নাই মা, এখানে কোনো মায়া-দয়া নাই। কারো কোনো দোষ নাই মা। নিজেই আইছি মা, কারো কোনো দোষ দিও না। কেউরে ফোন-টোন দিও না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাকে সান্ত্বনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন তোমারে মিস করি মা। তোমার লাইগা আমার কলিজাটা ফাইটা যায় মা। তুমি দোয়া করো আমার লাইগা মা… টেনশন করো না মা।’
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে ওঠা সাগর প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। কিশোর বয়স থেকেই রিকশা-ভ্যান চালিয়ে পরিবারের আর্থিক সহায়তা করতেন। উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে ভ্যান চালানোর সুবাদে ওই দোকানের এক ম্যানেজারের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ওই ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে বিদেশে গেলেও সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় ছিল। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে তিনি আবারও ওই দোকানে চাকরি নেন। পরে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে সাগরকে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর।
সেখানে একটি বেকারিতে কাজ নেন তিনি। মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বেতন পেতেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। পরে সেখানে এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি এবং এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখান বলে পরিবারের দাবি। সেই প্রলোভনে রাজি হয়ে চলতি বছরের মে মাসে বেকারির চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেন সাগর। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল বলেন, সাগর যখন বেকারির চাকরি ছেড়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা জানান, তখন তিনি তাকে বারণ করেছিলেন। তার ভাষ্য, সাগরকে ভুল তথ্য দিয়ে যুদ্ধে যুক্ত করা হয়েছে। যুদ্ধে যাওয়ার আগে সাগর তার ব্যাংক হিসাবে তিন লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সাগরের বাবা কবির হোসেন বলেন, তিনি সবজির ব্যবসা করতেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে অসুস্থ। অনেক ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। গত চার-পাচ মাস ধরে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। এখন ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি ভেঙে পড়েছেন।
এ বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। খোজ নিয়ে দেখবেন।
