কালবেলা · খেলাধুলা
সুনামগঞ্জে মেয়েদের ফুটবলের পর এবার নারী বাউল শিল্পীদের গান নিয়ে আপত্তি
২২/১০/২০২৬

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের জন্মভূমি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে এবার নারী বাউল শিল্পীদের গান পরিবেশন নিয়ে আপত্তি ওঠেছে। স্থানীয় দুই ব্যক্তির লিখিত আবেদনের পর প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় গানের অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আয়োজকরা।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তিতে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও স্থগিত করা হয়েছিল। পরপর দুটি ঘটনায় ভাটির জনপদে সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্বাধীনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বাউল গানের আসর আয়োজনের কথা ছিল। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী স্থানীয় বাসিন্দা শওকত আলী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে তানিশা ও নিলা নামে দুই নারী বাউল শিল্পীর গান পরিবেশনের কথা ছিল। এ উপলক্ষে এলাকায় পোস্টারও লাগানো হয়।
তবে বুধবার (২১ অক্টোবর) অনুষ্ঠানটি বন্ধ বা স্থগিত করার উদ্যোগ নিতে দিরাই থানায় লিখিত আবেদন করেন স্থানীয় দুই বাসিন্দা আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু। আবেদনে তারা গ্রামবাসীর পক্ষে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান।
আবেদনে বলা হয়, হাতিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা, একজন আল্লাহর ওলির মাজার এবং অনেক আলেম-ওলামার বসবাস রয়েছে। সেখানে গানের অনুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন আবেদনকারীরা।
তাদের অভিযোগ, আয়োজকদের প্রচার অনুযায়ী অনুষ্ঠানে নারী শিল্পীদের দিয়ে গান পরিবেশনের ব্যবস্থা ছিল। এ আয়োজন অব্যাহত থাকলে উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। একই সঙ্গে এলাকার ধর্মীয় ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গ্রামটিতে আগে এ ধরনের আয়োজনের নজির নেই। তাদের দাবি, এলাকার ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি অটুট থাকুক। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা, সংঘাত বা সহিংসতা না ঘটুক।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গানের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আপত্তি পাওয়ার পর আমরা আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, গান-বাজনা করবেন না। ফলে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে।’
বাউল গানের ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত দিরাইয়ে এমন আয়োজন বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আবেদনকারীরা বাউল গানের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাননি। নারী শিল্পীদের উপস্থিতি নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। নারী শিল্পীদের কারণে অশ্লীল নৃত্যসহ অসামাজিক কার্যকলাপ হতে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কার কথা তারা আবেদনে উল্লেখ করেছেন। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলে তারা অনুষ্ঠান বন্ধের আবেদন করেন।
প্রসঙ্গত, গত ৫ অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তির মুখে স্থগিত করা হয়। দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মেয়েদের মধ্যে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল।
স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও কোচ রাকিব আহমেদ ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, খেলার আগের রাতে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গিয়ে ম্যাচটি বন্ধের দাবি জানান। পরে ইউএনওর সঙ্গে আলোচনার পর ম্যাচটি স্থগিত করা হয়।
রাকিব আহমেদ বলেন, দিরাই পৌর এলাকার চণ্ডীপুরের বাসিন্দা মাওলানা শরিফ উদ্দিনসহ কয়েকজন খেলার নামে ‘অশ্লীলতা’ বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। ইউএনও কার্যালয় থেকে বেরিয়ে তারা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। পরে প্রশাসনের নির্দেশে তাদের খেলাটি স্থগিত রাখতে হয়।
বাউল গান ও লোকসংস্কৃতির জন্য পরিচিত দিরাইয়ে এক মাসের ব্যবধানে নারী শিল্পীদের গান এবং মেয়েদের ফুটবল আয়োজন নিয়ে আপত্তির ঘটনায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗