সিলেটে নারী শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে ২০১৮ সালে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আট বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি নির্মাণ কাজ।
সবমিলিয়ে প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ৬৫ শতাংশ। অথচ একই প্রকল্পের আওতায় বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুরে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, করোনা মহামারি, বন্যা ও ঠিকাদার পরিবর্তনের কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। তবে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ওই বছরই প্রতিষ্ঠানটি চালু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার বদিকোনায় ৩ একর ৩৮ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ইনস্টিটিউটের সাতটি ভবন। প্রকল্পটির মধ্যে রয়েছে ছয়তলা অ্যাকাডেমিক ভবন, ছয়তলা প্রশাসনিক ভবন, ছয়তলা ওয়ার্কশপ ভবন, একতলা অধ্যক্ষের বাসভবন, পাঁচতলা ডরমিটরি, ২০০ শয্যার চারতলা ছাত্রীনিবাস এবং তিনতলা স্টাফ কোয়ার্টার।
সরেজমিনে দেখা যায়, অ্যাকাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে ভবনটির ভেতরে ও বাইরে পলেস্তারা এবং রং করার কাজ বাকি রয়েছে। ওয়ার্কশপ ভবন, স্টাফ কোয়ার্টার ও ডরমিটরির নির্মাণকাজ চলছে।
ছাত্রীনিবাসের কাজ তুলনামূলক পিছিয়ে। সেখানে তৃতীয় তলার ছাদ পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। চলছে চতুর্থ তলার ছাদের কাজ। অধ্যক্ষের বাসভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। প্রশাসনিক ভবনের চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে। চলছে দেয়াল নির্মাণ ও পঞ্চম তলার ছাদের কাজ।
প্রকল্প এলাকায় প্রবেশমুখে এখনো ফটক নির্মাণ করা হয়নি। সীমানাপ্রাচীরের কাজও বাকি। সাতটি ভবনের নির্মাণকাজ পৃথক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হলেও প্রকল্পের ব্যয়সহ অন্যান্য তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড দেখা গেছে মাত্র একটি। আরেকটি সাইনবোর্ড থাকলেও সেটি ছেঁড়া।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রথম উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০২১ সালে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ৪০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা করা হয়। পরবর্তী সংশোধনীতে প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪০১ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
পুরো প্রকল্পের মধ্যে সিলেটের জন্য বরাদ্দ ১১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি টাকার বেশি। সাতটি ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ কোটি টাকা।
প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি। সিলেটে জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় কাজ পিছিয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ছেড়ে দিলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও বিলম্ব হয়। পরে নতুন দরপত্রের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটে জমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়নে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছে। অন্য তিন বিভাগে আগে থেকেই জমি থাকায় সেখানে কাজ এগিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের তথ্য অনুযায়ী, ছয়তলা প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের জুনে। এ পর্যন্ত ভবনটির ৫৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একই বছরের জুলাইয়ে শুরু হওয়া অ্যাকাডেমিক ভবনের কাজ শেষ হয়েছে ৬৮ শতাংশ। জুনে শুরু হওয়া ওয়ার্কশপ ভবনের কাজের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ।
এ ছাড়া অধ্যক্ষের বাসভবনের ৮২ শতাংশ, ডরমিটরি ভবনের ৬২ শতাংশ, স্টাফ কোয়ার্টারের ৩২ শতাংশ এবং ছাত্রীনিবাসের ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ হয়েছে ৯০ শতাংশ। সীমানাপ্রাচীর ও ফটক নির্মাণের অগ্রগতি ২২ শতাংশ।
তবে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, জেনারেটর, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, নালা ও শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এসব কাজের দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে কোন ভবনের নির্মাণকাজে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সে তথ্য দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ও প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহীন হোসেন বলেন, ‘সীমানাপ্রাচীর ও ফটক, ড্রেন, অভ্যন্তরীণ রাস্তা এবং শহীদ মিনারসহ অন্যান্য কাজের দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিগগির এসব কাজ শেষ হবে।’
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিন খান বলেন, ‘প্রকল্পের সাতটি ভবনের নির্মাণকাজ চলমান। সিলেটে এ পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘সিলেটে মূলত ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ছেড়ে দেয়। পরে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। সাতটি ভবন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৪৬ কোটি টাকা।’
সিলেট মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ফুড এবং গ্রাফিক ডিজাইন টেকনোলজি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শুরুতে দুটি বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ফুড ও ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ভূঁঞা বলেন, ‘২০২৭ সাল থেকে সিলেট মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পুরোদমে চালু করা সম্ভব হবে। করোনাভাইরাস মহামারি ও বন্যার কারণে কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেটে তুলনামূলক কম শিক্ষার্থী থাকায় প্রথমে দুটি বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ফুড ও ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
গুগলে আমাদের খবর পেতে
