নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে আমরা ভারতে হিন্দুধর্মের নামে নানা কর্মকা- লক্ষ্য করে আসছি। যেখানে উগ্রতা, বিদ্বেষ, সহিংসতা প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। এগুলো তো ধর্মের সাথে যায় না। ধর্ম তো শান্তি ও সংযমের কথা বলে, আত্মশুদ্ধির কথা বলে। এর বাইরেও ধর্মের বয়ান রয়েছে, সব ধর্মের বয়ান অবশ্য এক রকমন নয়। পথ ও পাথেয় বিষয়ে তো পার্থক্য আছেই, লক্ষ্য ও কর্মপন্থায়ও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য-যার মূলে রয়েছে ধর্ম-দর্শন ও বিশ^াসের বিশাল ভুবন। ধর্মে যেমন দৃশ্যজগৎ আছে, তেমিন আছে অদৃশ্য জগৎও। ইসলাম ধর্মে অদৃশ্য জগৎ বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যাকে বলা হয় ঈমান বিল গায়েব। ধর্মের বিষয়-আশয় নিয়ে অনেক আলোচনা আছে, আছে সমালোচনাও। অবশ্য সব আলোচনা-সমালোচনা সুখকর নয়। জ্ঞান ও রুচির সংকটে কোনো কোনো বয়ান শুধু অশ্রাব্য হয়ে ওঠে না, ধারণ করে সংহার মূর্তিও। এখানে জানার বার্তা উপলব্ধির কোনো মনোবৃত্তি থাকে না। ফলে প্রশ্ন জাগে, ভারতে এখন ধর্মের নামে যা চলছে তা কি ধর্ম¯œাত, নাকি রাজনীতিপুষ্ট?
ভারতে হিন্দু ধর্মের নামে অব্যাহত বিভিন্ন প্রশ্নবোধক কর্মকা- দেখে এই ধর্ম সম্পর্কে আবার জানার প্রবৃত্তি হলো। এতো এক বিশাল এবং জটিল জগৎ। রহস্যঘনও বটে। পাঠকদের জন্য সহজ কিছু বিষয় উপস্থাপন করা যায়। হিন্দু ধর্ম আসলে বিশে^র একটি প্রাচীন ধর্ম। হিন্দুস্থানেই এ ধর্মের উৎপত্তি ও বিকাশ। কারো কারো মতে হযরত নুহ (আ:)-এর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সাথে হিন্দু ধর্মের কিছু মিল আছে। কিন্তু অধিকাংশ গবেষক-এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। সিন্ধু নদের নাম থেকে হিন্দু জাতি ও ধর্ম। ফারসিতে সিন্ধুর উচ্চারণ ‘হিন্দু’। হিন্দু ধর্ম ক্রমরূপান্তরের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।
স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) বলেছেন, ‘হিন্দু ধর্ম কোনো ধর্মপ্রচারক ব্যক্তিবিশেষ দ্বারা প্রবর্তিত হয় নি। বৌদ্ধ ধর্ম, খৃস্টান ধর্ম বা ইসলামের মতো হিন্দুধর্মে কোনোকালে একজন ধর্মগুরু বা নেতা ছিলেন না, বেদে বা উপনিষদে হিন্দুধর্ম বলে কোনো ধর্মের উল্লেখ নেই। গীতাতেও নেই। এমন কি মনু-স্মৃতিতেও নেই।’ মাহাত্মা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮) বলেন, ‘আমাদের ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম, হিন্দু ধর্ম নয়। মুসলমানগণ আমাদেরকে এ নামে অভিহিত করেন।’ নীরদ সি চৌধুরিরও একই মত। এনসাইক্লোপিডিয়া বৃটানিকায় হিন্দুদের সাধারণ কয়েকটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে : ক. আত্মন ও ব্রাহ্মণের তত্ত্বে বিশ^াস, খ. ইস্টদেবতা ও ত্রিমূর্তিতে বিশ^াস, গ. বেদ-ব্রাহ্মণে বিশ^াস, ঘ. পুনর্জন্ম ও কর্মফলে বিশ^াস। স্বামী শ্রীবিষ্ণু শিবানন্দ ঘিরির মতে-‘যিনি বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় নিষ্ঠাবান; গোবৎস, বেদবাক্যকে মাতৃতুল্য মনে করেন; দেবমূর্তির আবজ্ঞা করেন না, সকল ধর্মকে সমাদর করেন, পুনর্জন্মে বিশ^াসী, মুক্তি প্রয়াসী তিনিই হিন্দু এবং তার আচরিত ধর্মই হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত।’ প্রশ্ন হলো, মোদির ভারতে এখন হিন্দুধর্মের নামে যে হিংসা ও উগ্রতা চলছে তা হিন্দু ধর্মের মর্মকথার সাথে কতটা যায়? স্বামী শ্রীবিষ্ণু শিবানন্দ গিরির মতে তো একজন প্রকৃত হিন্দুকে ধর্মীয় আচার-আচরণ মান্য করার সাথে সাথে কর্মফলে বিশ^াসী হতে হবে, সকল ধর্মকে সমাদর করতে হবে এবং হতে হবে মুক্তি প্রয়াসী। মোদির ভারতে উগ্র হিন্দুরা কি এ পথে চলছেন, নাকি তারা হয়েছেন পথভ্রষ্ট?
একজন প্রকৃত হিন্দু তো সকল ধর্মকে সমাদর করার কথা, কিন্তু হিন্দু ধর্মের নামে ভারতে এখন কী চলছে? নব্বইয়ের দশকে করসেবকদের উন্মত্ততায় ধ্বংস হয়েছিল ঐতিহাসি বাবরি মসজিদ। কয়েক দশক পর সেই একই চিত্র যেন আজ আবার ফিরে আসলো ভিন্নরূপে। তবে এবার আর কোনো উন্মত্ত জনতা নয়, বরং খোদ বিজেপি সরকারের প্রশাসনের মদতে এবং বুলডোজারের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থান। ভারতের সংবিধানে সব ধর্মের এবং ধর্মীয় স্থানের সুরক্ষার কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হলেও বাস্তব চিত্র এখন অন্যরকম। বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের একাংশ ভাঙার ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের অসহায়ত্বকে আরো একবার প্রকট করে তুললো। প্রশাসন গায়ের জোরে এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যেখানে নিজিদের ধর্মীয় স্থান রক্ষায় প্রতিবাদ করতে গেলে জুটছে লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও পুলিশি মামলা।
কড়া পুলিশ পাহারায় ব্যারিকেড দিয়ে টানা কয়েকদিন ধরে শাহী মসজিদ ভাঙচুরের কাজ করে প্রশাসন। এমন অপকর্মকে সিদ্ধ করার জন্য বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের কুম্ভ মেলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাস্তা প্রশস্ত করার প্রয়োজনে মসজিদ ভাঙচুরের কাজটি করতে হয়েছে। এমন বক্তব্য কি কোন সভ্য দেশে, সভ্য সমাজে দেওয়া যায়? অবশ্য কোনো সরকারের নীতি যদি হয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও অধিকার হরণ, তাইলে তো সে দেশের সংবিধান প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। মুসলিম ধর্মীয় স্থান রক্ষা প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন নীতি গ্রহণ করেছে প্রশাসন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক এই শাহী মসজিদ ভাঙা আটকাতে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এই ঘটনার জেরে উজ্জয়িনী পুলিশ ইতিমধ্যে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ৩০ জনেরও বেশি মুসল্লির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। উজ্জয়িনীর মহাকাল, খারাকুয়া এবং কোতোয়ালিÑএই তিনটি থানায় মোট সাতটি মামলা দয়ের করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জনতা তাদের ওপর পাথর ছুঁড়েছিল এবং কাজে বাধা দিয়েছিল। প্রশ্ন জাগে, নিজের ধর্মীয় স্থান ভাঙচুরের কাজে বাধা দেওয়া কি অন্যায়? অ্যাসোসিয়শেন অব প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস-এর মধ্যপ্রদেশ রাজ্য সমন্বয়ক জায়েদ পাঠানের তথ্য মতে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জনকে ইতোমধ্যে আদালতে মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান কেবল মাঠ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, সামাজিক মাধ্যম এবং অন্যান্য সমাবেশের ওপরও আইনি কঠোরতা নেমে এসেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাংবিধানিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মীয় স্থান রক্ষায় বর্তমানে একেবাইে অসহায় এবং কোণঠাকা। একদিকে উন্নয়নে নামে প্রশাসনিক বুলডোজার এবং অন্যদিকে প্রতিবাদ করলেই আইন ব্যবস্থার সাঁড়াশি আক্রমণÑ এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ভারতের মুসলিমদের নাগরিক অধিকার আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাবরি থেকে উজ্জয়িনী যেন একই সূত্রে গাঁথা। উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের সেই সূত্র নরেন্দ্র মোদির আমলে নতুন মাত্রা পেয়েছে। তার বিস্তার এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গেও। কারণ এবার এই রাজ্যে বিজয় পেয়েছে মোদির বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চরম উগ্রবাদ ও সংখ্যালঘু নিধনের ভয়াবহ চিত্র। নিছক গরু পাচারের সন্দেহ উসকে দিয়ে শিলিগুড়ির মাটিগাড়া-বাগডোগরা এলাকায় পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে দুই মুসলিম যুবককে। ‘গো-রক্ষাকারীদের’ এমন পৈশাচিক বর্বরতায় আরো একবার ভারতের মাটিতে মুসলমানদের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও করুণ পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে। ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে কলকাতার বিশেষ প্রতিনিধির সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২ অক্টোবর গভীর রাতে তারাবাড়ি এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান ও একচি চারচাকা গাড়ি প্রবেশ করতেই উন্মত্ত উগ্রবাদীরা ঘিরে ধরে। কোনো প্রকার যাচাই বা আইনি পদক্ষেপের তোয়াক্কা না করেই তারা শুরু করে নির্মম গণপিটুনি। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বাসিন্দা ভ্যানচালক শহিদ আখতারকে গাড়ি থেকে নামিয়ে বড় পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। পরে পিকআপ ভ্যানটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় প্রাণভয়ে গাড়িটি ফেলে পালানোর চ্যষ্টা করে আরো চার যুবক। উগ্রবাদীরা তাদের ধাওয়া করে বাগডোগরার ধিমাল বস্তি এলাকায় ধরে ফেলে। সেখানেও চলে নিষ্ঠুর মারধর ও নির্যাতন। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হরিয়ানার শাদ মুহাম্মদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
ভারতে এমন হত্যা-সন্ত্রাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মুসলিম নিধনের এক সুপরিকল্পিত ঘৃণ্য চক্রান্ত। ‘গো-রক্ষার নামে একশ্রেণির উগ্রবাদী হিন্দু আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুযোগে মুসলমানদের ওপর নিয়মিত চালানো হচ্ছে প্রাণঘাতী হামলা। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলা হয়Ñ সেখানেও এখন মুসলমানদের প্রকাশ্যে গণপিটুনিতে ও পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটছে। বিজেপি সরকার গঠনের পর পশ্চিমবঙ্গে এমন উগ্রতা ও সহিংসতার বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে মোদির বিজেপি সরকারের বৈশিষ্ট্য উৎকটভাবে স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারতের সব নাগরিক মোদিভক্ত নন। তারা ‘ধর্মের চর্চা’ এবং ‘ধর্মকে ব্যবহারের’ মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেই বিষয়টি বোঝেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘরে প্রবেশ করছে? ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ভয় দেখিয়ে শাসন করা। মোদির বিজেপি সরকারের নেতারা তো ধর্মের নামে ভয় দেখাচ্ছেন, আবার ‘ভোট ও নির্বাচন’ তথা ক্ষমতার নামেও ভয় দেখাচ্ছেন। এ কারণে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)সহ ভারতের বিরোধী জোট এখন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের নানা অপকর্ম, কোটি কোটি বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং নতুন তরুণ ভোটারদের তালিকায় নাম লেখাতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতের ছাত্র-জনতা এখন রাজপথে সরব। এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে চলছে দমন-পীড়ন এবং জেল-জুলুম। ভয় দেখিয়ে, ষড়যন্ত্র করে দেশ শাসনের যে সংস্কৃতি; তা কোনো সভ্য দেশে, গণতান্ত্রিক দেশে চলতে পারে না। ভারতের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের যাত্রা শুরু হয়েছে অনেক আগে; এখন আবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ। দ্বিবিধ ফ্যাসিবাদের দৌরাত্ম্য ভারতের জন্য এক বড় অশনিসংকেত। দেশটির ছাত্র-জনতা এর বিরুদ্ধে নেমে এসেছে রাজপথে। এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি সরকার কখনো পড়ে নি। এখন দেখার বিষয় হলো ঐতিহাসিক এই চ্যালেঞ্জে কে হারে, কে জিতে।
