মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ফ্রান্সে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে সহিংস সংঘর্ষে গড়িয়েছে। গতকাল দেশটির বিভিন্ন স্থানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিন আনুমানিক ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। খবর বিবিসি।
রাজধানী প্যারিসে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ চলে। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ।
প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভবনে আগুন দেয় বিক্ষুদ্ধ ব্যক্তিরা। লিমোজ শহরে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে পৌরসভা ভবনের ছাদের একাংশ ধসে পড়ে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানান, বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষে ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
প্যারিসে বিকালে শুরু হওয়া মূল মিছিলটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। সেখানে অংশ নেয়া কয়েকজন তরুণ জানান, তারা ‘শান্তিপ্রিয়’ এবং ‘শুধু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছুই এগোচ্ছে না’।
তবে দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভে যুক্ত একটি অংশ সড়কে আগুন জ্বালায় এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এর মধ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্লাস দ্য লা রিপাবলিকও রয়েছে।
দোকানপাটে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে পুড়ে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি দলের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা গেছে।
লিওঁ শহরের মেয়র গ্রেগরি দুসে শহরের পর্যটন দপ্তরের ভবনে আগুন দেয়ার ঘটনাকে ‘শহরের জন্য একটি ট্র্যাজেডি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। কারণ, এটি অত্যন্ত পরিচিত ও ঐতিহাসিক একটি ভবন।’
স্থানীয় পুলিশ জানায়, ‘সহিংসতাপ্রবণ ব্যক্তিরা’ দমকলকর্মীদের নিরাপদে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেন।
লিমোজের পৌরসভা ভবনেও আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন দমকলকর্মীরা। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, আগুনে ভবনটির একাংশ ধসে পড়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সাঁ-এতিয়েনের মেয়র রেজি হুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ‘গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত উড়ে গেছে’। তিনি লেখেন, ‘এমন মর্মান্তিক ঘটনা কখনোই ঘটা উচিত নয়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জেতে মুখোশধারীদের মাধ্যমে ‘লক্ষ্যবস্তু করে সহিংসতা’ চালানো হয়েছে।
গ্রেনোবল, আভিনিয়োঁ, পো, মনপেলিয়ে ও ভালঁসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ থেকে বৃহত্তর বিক্ষোভ
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সের কয়েক লাখ শিক্ষার্থী শিক্ষক ও কর্মীসংকট এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে আসছেন। দেশটিতে ১৫-১৮ বছর বয়সীদের পড়াশোনার প্রতিষ্ঠানগুলোয় এসব সমস্যা প্রকট।
শনিবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য ও অন্যান্য গোষ্ঠী।
এদের মধ্যে রয়েছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের সদস্যরাও। ২০১৮ সাল থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন করে আসা এই গোষ্ঠী ফ্রান্সের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদী আন্দোলনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংস অস্থিরতার ঘটনা নতুন নয়। তবে এবারের বিক্ষোভ এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটি গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।
আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদ শেষ হবে। এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হতে পারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এ নির্বাচন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে উঠতে পারে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা মারিন লো পেন এবং কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ।
মেলঁশোঁ ফ্রান্সের বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ঝাঁপিয়ে পড়েছে’। তবে একইসঙ্গে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের নিন্দা জানান।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু এ মন্তব্যকে ‘বিপজ্জনক ও কপটতাপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন।
এর আগে লেকর্নু বলেছিলেন, পুলিশকে ‘অত্যন্ত তীব্র সহিংসতার’ মুখে পড়তে হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রস্তুতি হিসেবে এই বিক্ষোভকে ব্যবহার করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘কেউ সহিংসতার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না।’
লো পেন বলেন, বিক্ষোভকারীদের উত্থাপিত ‘যৌক্তিক দাবিগুলোকে কট্টর বামপন্থীরা জিম্মি করে ফেলেছে’। সহিংসতা উসকে দেয়ার জন্য তিনি মেলঁশোঁকে দায়ী করেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ‘যারা প্রিফেকচার (স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যালয়) ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাংচুর করেছেন, হামলা চালিয়েছেন, এমনকি আমাদের পৌরসভা ভবনগুলোতেও লুটপাট করেছেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেয়া হবে।’
সরকারের আশ্বাসেও থামেনি বিক্ষোভ
বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে সরকার কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অতিরিক্ত ৩ হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে সরকারের এসব আশ্বাসের পরও বিক্ষোভ থামেনি; বরং তা আরো তীব্র হয়েছে।
