কালবেলা · স্বাস্থ্য
মানুষ কেন বারবার প্রাক্তনের সোশ্যাল মিডিয়া দেখে?
২৫/১০/২০২৬

সম্পর্ক ভেঙে গেছে, সব যোগাযোগ বন্ধ, জীবনও হয়তো নিজের মতো বয়ে চলেছে, তবুও গভীর রাতে বা কাজের ফাঁকে হঠাৎ আঙুল চলে যায় ফোনের স্ক্রিনে, আর সার্চবারে টাইপ হয়ে যায় প্রাক্তনের নাম! বহু মানুষের ক্ষেত্রেই সম্পর্ক শেষের পরও প্রাক্তনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল বারবার ঘুরে দেখার এক অদ্ভুত তাগিদ তৈরি হয়।
কেন এমন হয়? এটি কি শুধুই কৌতূহল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ? ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বেঙ্গালুরুর মার্গ মাইন্ড কেয়ার-এর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুহাস কে. এই স্বভাবের পেছনের মানসিক ব্যাখ্যা ও সমাধান তুলে ধরেছেন।
প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে যে বিচ্ছেদের পরও ভার্চুয়াল জগতে প্রাক্তনের প্রোফাইলে উঁকিঝুঁকি মারা কোনো বিরল বিষয় নয় এবং এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু মানসিক ও সামাজিক কারণ কাজ করে।
মনস্তাত্ত্বিক কারণ: কেন কাটতে চায় না এই অভ্যাস?
১. ভার্চুয়াল রিমাইন্ডার ও ডিজিটাল পরিবেশ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ‘চোখের আড়ালে মানেই মনের আড়ালে’ ধারণাটি বজায় রাখা বেশ কঠিন। মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের স্টোরি, সাজেশন লিস্ট কিংবা হঠাৎ ভেসে ওঠা কোনো আপডেট মুহূর্তেই কৌতূহল জাগিয়ে তোলে এবং প্রাক্তনের প্রোফাইল চেক করতে প্ররোচিত করে। সোশ্যাল মিডিয়ার পূর্বে প্রাক্তনের খবর জানতে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বা পারস্পরিক পরিচিতদের ওপর নির্ভর করতে হতো; কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল পরিবেশে দুজনেই একই ভার্চুয়াল স্পেসে অবস্থান করায় এসব স্মৃতির মুখোমুখি হওয়া সহজ হয়ে গেছে।
২. সামাজিক তুলনা: বিচ্ছেদের পর প্রাক্তন তার জীবনে কতটা সুখী, সফল বা সামাজিকভাবে সক্রিয়—তা জানার একটি সুপ্ত প্রবণতা অনেকের মধ্যেই কাজ করে। একজন ব্যক্তি দেখতে চান যে তার প্রাক্তন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচ্ছেদ বা সম্পর্কের গল্পটিকে কীভাবে উপস্থাপন করছেন এবং অজান্তেই নিজের বর্তমান অবস্থার সাথে তার তুলনা শুরু করেন।
৩. অসমাপ্ত আবেগ ও ‘ক্লোজার’-এর সন্ধান: মনোবিজ্ঞানী সুহাসের মতে, প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখা মানেই যে সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা কাজ করছে—তা নয়। এর পেছনে থাকতে পারে জমাটবদ্ধ আবেগ, পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রাখা কিংবা মানসিকভাবে শান্তি বা 'ক্লোজার' পাওয়ার চেষ্টা। অনেকেই দেখতে চান প্রাক্তন কত দ্রুত নতুন জীবনে এগিয়ে গেছেন, কিংবা বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাদেরও একইভাবে কষ্ট দিচ্ছে কি না, তার কোনো সংকেত খোঁজার চেষ্টা করেন।
৪. ফোমো এবং অভ্যাসে রূপান্তর: ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ও এখানে কাজ করে। সময়ের সাথে সাথে এটি দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। একাকীত্ব, একঘেয়েমি, পুরোনো কোনো স্মৃতি কিংবা সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ খোলার অভ্যাসও মানুষকে পরিচিত সেই প্রোফাইলে টেনে নিয়ে যায়।
অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসার ৫টি কার্যকর উপায়
সাইকোলজিস্ট সুহাস কে. প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার এই ক্ষতিকারক অভ্যাস ভেঙে ফেলার জন্য ৫টি বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন:
ট্রিগার চিহ্নিত করুন: কোন পরিস্থিতি আপনাকে প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখতে বাধ্য করছে তা লক্ষ্য করুন। এটি হতে পারে একাকীত্ব, অলস সময়, বন্ধুদের পোস্ট বা পুরোনো স্মৃতি। ট্রিগার চিহ্নিত করতে পারলে বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।
প্রোফাইলে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করুন: সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের অ্যাকাউন্ট মিউট বা আনফলো করা, মেসেজ আর্কাইভে রাখা এবং সহজে প্রোফাইলে ঢোকার সুযোগ বন্ধ করা প্রয়োজন। ভার্চুয়াল জগতে তাদের উপস্থিতি যত কম দৃশ্যমান হবে, দেখার ঝোঁক তত কমবে।
ইচ্ছা বিলম্বিত করুন: হঠাৎ প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার তীব্র ইচ্ছা জাগলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন হাতে না নিয়ে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এই সময়ে হাঁটা, বন্ধুর সাথে কথা বলা কিংবা গান শোনার মতো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে আবেগটি থিতিয়ে আসে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টারকৃত বাস্তবতা বুঝুন: মনে রাখা জরুরি যে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রোফাইল হলো একটি সাজানো বা এডিট করা বাস্তবতা। সেখানে প্রাক্তনের উপস্থাপিত জীবন দেখে নিজের মানসিকভাবে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার তুলনা করা ভুল।
পরবর্তী মানসিক প্রভাব লক্ষ্য করুন: বারবার প্রোফাইল দেখার পর যদি দুশ্চিন্তা, হতাশা, হিংসা, ঘুমের ব্যাঘাত কিংবা মানসিক অশান্তি তৈরি হয়, তবে উপলব্ধি করুন যে এই চর্চাটি আপনার মনের ক্ষতিই বাড়াচ্ছে।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?
যদি প্রাক্তনের অনলাইন অ্যাক্টিভিটি দেখার পর বা বিচ্ছেদের ধাক্কায় ক্রমাগত তীব্র মানসিক দুশ্চিন্তা, হতাশাবোধ, ঘুমের সমস্যা তৈরি হয় এবং প্রতিদিনের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ব্যাহত হতে থাকে, তবে দেরি না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একজন বিশেষজ্ঞ এই মানসিক চাপ ও বিচ্ছেদের বেদনা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর পথপ্রদর্শন করতে পারেন।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗