স্ত্রী ও মাত্র ১৮ মাসের শিশুকন্যাকে খুনের মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ, জলপাইগুড়ি। তবে অভিযুক্ত লাল সিং ওরাঁওয়ের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ। মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে আদালত জানিয়েছে, এই ঘটনাকে ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ অপরাধ হিসেবে গণ্য করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা থানায় লাল সিং ওরাঁওয়ের বিরুদ্ধে স্ত্রী শাখি ওরাঁও এবং তাঁদের ১৮ মাসের কন্যা মামতা ওরাঁওকে খুনের অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযোগ, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁদের আঘাত করে খুন করার পর অভিযুক্ত নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থল থেকে স্ত্রী ও শিশুকন্যার দেহ উদ্ধার হয় এবং অভিযুক্তকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তদন্তের পর ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩০৯ ধারায় মামলা চলে। বিচার শেষে নিম্ন আদালত খুনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড এবং আত্মহত্যার চেষ্টার অপরাধে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল।
হাইকোর্টে মামলার শুনানিতে সাক্ষীদের বয়ান, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ পর্যালোচনা করে ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। সেই কারণে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম সাজা দেওয়ার আগে অপরাধের গুরুত্বের পাশাপাশি অভিযুক্তের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, মানসিক অবস্থা এবং সংশোধন ও পুনর্বাসনের সম্ভাবনাও বিচার করা জরুরি। রায়ে আদালত উল্লেখ করেছে, অভিযুক্তের পূর্বে কোনও অপরাধের রেকর্ড ছিল না। জেল কর্তৃপক্ষের রিপোর্ট অনুযায়ী, কারাবাসে তাঁর আচরণ সন্তোষজনক এবং সংশোধনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জলপাইগুড়ি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মনোচিকিৎসা সংক্রান্ত চিকিৎসাও নিচ্ছিলেন। বিচারপতিদের মতে, মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই বিষয়গুলি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত ছিল।
এই যুক্তিতেই নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ বহাল রাখেনি হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, তদন্ত ও বিচার চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত যত দিন হেফাজতে কাটিয়েছেন, আইন অনুযায়ী সেই সময় সাজা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। এই রায়ে আরও একবার স্পষ্ট হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে শুধু অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করাই যথেষ্ট নয়। অভিযুক্তের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, কারাগারে আচরণ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতে সংশোধনের সম্ভাবনাও বিচার করতে হবে। নিম্ন আদালত অভিযুক্তের জেল-আচরণের রিপোর্ট সংগ্রহ না করায় সাজা নির্ধারণে গুরুতর ত্রুটি হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে হাইকোর্ট।
