ময়মনসিংহ নগরীর দুর্গাবাড়ি মন্দিরে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে মহানবমী। ছবি: খবরের কাগজ
ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ আর মন্ত্রোচ্চারণে মুখর ময়মনসিংহের দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো। দেবী দুর্গার চরণে ফুল, বেলপাতা ও দূর্বা দিয়ে অঞ্জলি, ভোগ নিবেদন, আরতি ও যজ্ঞ এমন নানান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গতকাল উদযাপিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী।
ময়মনসিংহ নগরীর মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতিতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে আনন্দের আবহের মধ্যেই বাজতে শুরু করেছে বিদায়ের সুর।
মহানবমী উপলক্ষে নগরীর দুর্গাবাড়ি মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড় দেখা যায়। পূজামণ্ডপে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান ভক্তরা। ফুল, বেলপাতা ও দূর্বাসহ পূজার উপকরণ হাতে নিয়ে তারা দেবীর চরণে অঞ্জলি দেন। পূজা-অর্চনা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। নগরীর অন্যান্য মন্দির ও পূজামণ্ডপেও বিশেষ পূজা, আরতি, যজ্ঞ ও ভোগ নিবেদনের আয়োজন করা হয়।
আরও পড়ুন
অঞ্জলি দিতে আসা আরতি নামে এক ভক্ত বলেন, ‘মহানবমী আমাদের কাছে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, আত্মশুদ্ধি ও মঙ্গল কামনারও দিন। আমরা চাই, দেবীর আশীর্বাদে মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ কমুক, সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক।’
শুভ চন্দ্র দাস নামে আরেক ভক্ত বলেন, ‘প্রতিবছর পরিবারের সবাইকে নিয়ে পূজায় আসার চেষ্টা করি। এই উৎসব আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ করে দেয়। তবে উৎসবের শেষ দিনগুলোতে মনটা একটু খারাপও হয়ে যায়। আবার একটি বছরের অপেক্ষা শুরু হবে।’
আরও পড়ুন
মহানবমীর ধর্মীয় তাৎপর্য ঘিরেও ভক্তদের মধ্যে ছিল বিশেষ আগ্রহ। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, দেবী দুর্গার আশীর্বাদ নিয়ে শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে বধ করেছিলেন। এই বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করেই মহানবমীতে বিশেষ পূজা ও যজ্ঞের আয়োজন করা হয়।
পূজামণ্ডপে আসা অয়ন সাহা নামে এক তরুণ ভক্ত বলেন, ‘দুর্গাপূজা আমাদের কাছে আনন্দের পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর প্রেরণা। দেবী দুর্গার বিজয়ের তাৎপর্য থেকে আমরা সাহস, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার শিক্ষা নিতে পারি।’
এদিকে মহানবমীর পূজা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তির ক্ষণ আরও ঘনিয়ে এসেছে। বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। শেষ দিনের আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে ভক্তদের মধ্যে যেমন রয়েছে প্রস্তুতি, তেমনি রয়েছে প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগ।
ভক্তদের প্রত্যাশা, দেবী দুর্গার আশীর্বাদে অশুভ শক্তির বিনাশ হবে, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে এবং পৃথিবীতে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মহানবমীর এই আয়োজন মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরও জোরদার করবে।
ময়মনসিংহ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ৮০৬টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ নগরীতেই রয়েছে ৯০টি মন্দিরে পূজার আয়োজন।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক শংকর সাহা বলেন, ‘এবার খুবই উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা আর মানুষের মিলনমেলায় নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় উৎসবের আবহ।’
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘পূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। আশা করছি, বিসর্জন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না এবং এই আনন্দমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে।’
