আজ দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক পরম শোকের দিন। ১৯৮৭ সালের এই দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওপারে সুরের আকাশকে স্তব্ধ করে বিদায় নিয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী কিশোর কুমার এবং এপারে লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম যাত্রাশিল্পকে অভিভাবকহীন করে চলে যান অনন্য মঞ্চাভিনেতা ‘যাত্রা সম্রাট’ অমলেন্দু বিশ্বাস। দুই ভিন্ন মাধ্যমের এই দুই মহানায়কের প্রয়াণ দিবস একই সুতোয় বেঁধে দিয়েছে দুই বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমীদের স্মৃতি ও সুরকে।
১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট জন্ম নেওয়া আভাষ কুমার গাঙ্গুলী, যিনি পরবর্তী সময়ে পুরো উপমহাদেশের কাছে হয়ে ওঠেন ‘কিশোর কুমার’। তিনি কেবল একজন গায়কই ছিলেন না; একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সুরকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার সিগনেচার ‘যোদেলিং’ এবং যেকোনো ভিন্নধর্মী আবেগকে কণ্ঠে ধারণ করার অসাধারণ ক্ষমতা বাংলা ও হিন্দি গানের জগতকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
১৯৮৭ সালের ১২ অক্টোবর তিনি লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের সঙ্গে জীবনের শেষ গান রেকর্ড করেন এবং তার ঠিক পরদিন, আজকের দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মুম্বাইতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর মুহূর্তেও চিরসবুজ এই মানুষটি তার স্বভাবসুলভ রসিকতায় স্ত্রী লীনা চন্দাভারকরকে বলেছিলেন, আজ তো আমার ছুটি। তার সেই চিরদিনের ছুটি আজ শ্রোতাদের হৃদয়ে এক অমলিন শূন্যতা তৈরি করে রেখেছে।
কিশোর কুমারের মহাপ্রয়াণের ঠিক একই দিনে ঢাকায় অবসান ঘটে বাংলাদেশের লোকনাট্য ও যাত্রাশিল্পের এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের। ১৯২৫ সালে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে জন্ম নেওয়া অমলেন্দু বিশ্বাস দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে থিতু হন এবং যাত্রাশিল্পকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান।
বজ্রকণ্ঠ, নিখুঁত সংলাপ প্রক্ষেপণ এবং অসাধারণ রাজকীয় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি কোটি দর্শকের হৃদয়ে স্থান করে নেন এবং ভূষিত হন ‘যাত্রা সম্রাট’ উপাধিতে। মাইকেল মধুসূদন, হিটলার বা নবাব সিরাজউদ্দৌলার মতো ঐতিহাসিক চরিত্রে তার জীবন্ত অভিনয় এদেশের আপামর মননকে আন্দোলিত করেছিল। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৯ সালে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হওয়া এই মহান শিল্পী ১৯৮৭ সালের আজকের দিনে পরলোকগমন করেন।
কিশোর কুমার এবং অমলেন্দু বিশ্বাসÑ দুজন দুই ভিন্ন মাধ্যমে কাজ করলেও সাধারণ মানুষের আবেগকে স্পর্শ করার জাদুকরী ক্ষমতা ছিল উভয়েরই। একজন সুরের মূর্ছনায় মাতিয়েছেন আধুনিক নাগরিক সমাজকে, অন্যজন তার নিখুঁত অভিনয়ের ধারায় আলোড়িত করেছেন বাংলার গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে শহুরে বোদ্ধামহলকে।
১৩ অক্টোবর এলেই তাই দুই বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমীরা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন এই দুই কীর্তিমানকে। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের সৃষ্টি আজও সমাদৃত ও প্রাসঙ্গিক। এই দুই নক্ষত্র তাদের মহৎ কর্মের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
