ঝিনাইদহ সংবাদদাতা, লোকসমাজ : স্বপ্নের দেশ ইতালিতে যাওয়ার আশায় ৪৬ লাখ টাকা দিয়েও শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি ঝিনাইদহের সোহেল রানা। পরিবারের অভিযোগ, ইতালি পাঠানোর কথা বলে একটি দালাল চক্র তাঁকে একের পর এক দেশে নিয়ে যায়। সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অবশেষে দেড় বছর ধরে নানা দেশে ঘোরানোর পর লাটভিয়ার একটি জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৮ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় সোহেলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা ঝিনাইদহের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ৬, ৭, ৮ ও ১০ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন শামছুন্নাহার (৫৫), তাঁর স্বামী শাহাজান সরকার (৫৮), তাঁদের দুই ছেলে সোহাগ (৩৫) ও নাসির সরকার (৩২), আবুল কালাম সরকারের ছেলে সোহেল রানা (৪১), শাহাজান সরকারের জামাতা আব্দুর রাজ্জাক (৫০), সোহাগ সরকারের স্ত্রী তন্নি সরকার (৩২), রিয়াদ দেওয়ান (৩৫) ও শরিফুল সরকার (৪৮)। তাঁদের সবার বাড়ি রামচন্দ্রপুর গ্রামে।
কাতার থেকে মিসর, এরপর বেলারুশ হয়ে লাটভিয়া
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সোহেলকে বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ২৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল তাঁকে কাতারে পাঠানো হয়। সেখানে ৯০ দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তাঁকে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি।
পরে দেশে ফেরার জন্য টিকিট পাঠানো হলে তাঁকে ফিরতে না দিয়ে মিসর হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়। এ জন্য আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ, ওই টাকা দেওয়ার পর ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট সোহেলকে মিসরে পাঠানো হয়।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সোহেলকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং তাঁর পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন দেশের মধ্য দিয়ে বেলারুশ হয়ে তাঁকে লাটভিয়ায় নেওয়া হয়। ২৫ আগস্ট তাঁর ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তারিখে টাকা পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত ৯ অক্টোবর ইতালি থেকে অভিযুক্তদের একজন ফোন করে আরও সাড়ে চার লাখ টাকা দাবি করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জঙ্গল থেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে মৃত্যু
সোহেলের শ্যালক ইশতিয়াক আহমেদ জানান, সোহেলকে বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে দেড় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো হয়। বেশ কিছুদিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, লাটভিয়ার সীমান্তরক্ষীরা ৬ অক্টোবর তাঁকে একটি জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ অক্টোবর সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
সোহেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান ইশতিয়াক।
একই চক্রের খপ্পরে আরও ১২ যুবক
সোহেলের এক সহযাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁকেও বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে কাতারে নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, ইতালিতে পৌঁছাতে তাঁকে অবৈধ পথে সীমান্ত পার হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। বর্তমানে তিনি দালালের কথায় বিভিন্ন দেশে ঘুরছেন এবং ওই পথে ইতালি যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ওই সহযাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনিসহ আরও ১২ জন এখনো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, সোহেল রানার মৃত্যুর খবর তিনি তাঁর শ্যালকসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে শুনেছেন। তাঁর জানা মতে, বিদেশে পাঠানোর নামে এই চক্রটি রামচন্দ্রপুরসহ হলিধানী ইউনিয়নের অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে। তাঁদের মধ্যে একই এলাকার ১২ যুবক বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এক যুগ ধরে নিখোঁজ কয়েকজন
সরেজমিন অনুসন্ধানে একই এলাকার আরও কয়েকজনের দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন গাড়ামারা গ্রামের রসুল মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া এবং রামচন্দ্রপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার আব্দুল্লাহর ছেলে হামেদ আলী ও মৃত তাইজেল মাস্টারের ছেলে জগত আলী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁরা একসঙ্গে নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালালদের মাধ্যমে যাত্রা করেছিলেন। এরপর থেকে তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এক যুগ ধরে পরিবারের সদস্যরা তাঁদের ফেরার অপেক্ষায় থাকলেও তাঁরা জীবিত আছেন, নাকি তাঁদের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
টাকা ফেরত চাওয়ায় হুমকির অভিযোগ
মামলার বাদী জেসমিন সুলতানা অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, টাকা ফেরত চাওয়া কিংবা আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে কথা বলতে গেলে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। গত ১৫ অক্টোবর তিনি ঝিনাইদহ সদর থানায় গেলে আদালতে মামলা করার পরামর্শ পান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোহেলের মৃত্যুর ঘটনা এবং একই এলাকার আরও কয়েকজনের নিখোঁজ থাকার তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে মানব পাচার ও বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগকে সামনে এনেছে। তবে মামলার অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি।
The post ৪৬ লাখ টাকা দিয়েও ইতালি যাওয়া হলো না সোহেলের, লাটভিয়ায় জঙ্গলে মৃত্যু appeared first on লোকসমাজ.
