Published on
:
2 min read
দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া
অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে প্রায় ছ’কিলোমিটার দূর থেকে ভেসে আসে মালিয়াড়া রাজবাড়ির তোপধ্বনির শব্দ। তার পরেই বলি হয় মাসকলাই। তবে এই বলিতে ব্যবহার করা হয় না কোনও অস্ত্র। বলিদান হয় মন্ত্রে। এখানে মণ্ডপে দুর্গার সিংহ আর কার্তিকের ময়ূর থাকলেও মায়ের বাকি তিন সঙ্গী গণেশ, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর বাহন থাকে না। দশভুজা এখানে পশ্চিমমুখী, যা সচরাচর দেখা যায় না।
সেখানেই শেষ নয়। এই পুজোয় হয় না চণ্ডীপাঠ। অষ্টমীতেও মাকে নিবেদন করা হয় অন্নভোগ। এমনই প্রাচীন রীতি ধরে রেখে প্রতি বছর দুর্গাপুজো হয় বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের চৈতন্যপুর গ্রামের আচার্য বাড়িতে। ৪০০ বছরের পুরোনো এই পুজোকে ঘিরে মাতেন চৈতন্যপুর–সহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা। আচার্য পরিবারের পূর্বপুরুষরা ছিলেন মালিয়াড়ার রাজার অধীনস্থ জমিদার। তাঁদের পদবি ছিল চট্টোপাধ্যায়। কথিত, কয়েকশো বছর আগে চৈতন্যপুরের পাশে তড়কাবাইদ গ্রামে প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। দেবীর স্বপ্নাদেশে পুজো শুরু করেন মাধব আচার্য নামে এক ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুর পরে পুজো ঘিরে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। সেই সময়ে মালিয়াড়ার রাজা চৈতন্যপুরের জমিদার পরিবারকে এই পুজোর দায়িত্ব দেন।পুজোর খরচ বহন করতে দেওয়া হয় কিছু নিষ্কর সম্পত্তি। সঙ্গে চৈতন্যপুরের জমিদার পরিবারকে চট্টোপাধ্যায় থেকে আচার্য পদবিতে ভূষিত করেন মালিয়াড়ার রাজা। জাঁকজমক করে শুরু হয় দুর্গাপুজো। বর্তমানে জমিদারি না–থাকায় কমেছে আড়ম্বর।
ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়েছিল মায়ের পুরোনো মন্দির। বছর সাতেক আগে তা ভেঙে সেই জায়গায় নতুন মন্দির তৈরি করে দেন গ্রামের বাসিন্দা দেবসাধন কর্মকার। গ্রামে আচার্যদের মোট পরিবার ছ’টি। পালা করে প্রতি বছর পুজোর দায়িত্ব পালন করে এক একটি পরিবার। পূর্ণ সহযোগিতা থাকে অন্য পরিবারগুলির। এ বার দায়িত্ব পেয়েছেন দুই ভাই মিঠুন ও টুটুন আচার্য। এখানে পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। প্রত্যেক দিন অন্নভোগ নিবেদন করা হয় মাকে। নবমীর অন্নভোগ গ্রহণ করেন গ্রামবাসীরা। পরিবারের অন্যতম সদস্য শান্তিময় আচার্য বললেন, ‘একটা সময়ে জমিদারি ছিল। ধুমধাম করে পুজো হতো। সেই সময় হারিয়েছে, আমাদের সংসারেও রয়েছে অভাব। তবে স্থানীয় বাসিন্দা থেকে আত্মীয়, বন্ধুদের সহযোগিতায় টিকে রয়েছে ৪০০ বছরের প্রাচীন এই পুজো।’ যোগ করেন, ‘আগের মতো আড়ম্বর না–থাকলেও ঐতিহ্য অটুট রয়েছে। প্রাচীন রীতি এবং রেওয়াজ মেনে হয় উমার আরাধনা।’
