বিগত অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি আলাদা বিভাগ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। মূল কাঠামো এভাবে নকশা করা হয়—এক দল শুধু করের নিয়মকানুন ও নীতি বানাবে, আর আরেক দল মাঠে গিয়ে সেই কর আদায় করবে।
এমন বদলের উদ্দেশ্য ছিল করব্যবস্থা নিয়ে করদাতাদের, বিশেষত ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের সুরাহা করা এবং কর আদায় বৃদ্ধি করা।
বর্তমান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও মূল এ পরিকল্পনা রেখে এনবিআরের সংস্কারের কথা বলছেন। কাগজে–কলমে উদ্যোগটি সংস্কার মনে হলেও বাস্তবে এই সংস্কার কতটা ফল দেবে, তা এখনই ভেবে দেখা দরকার।
আমাদের মনে আছে, অন্তর্বর্তী সরকার যখন এই সংস্কারের লক্ষ্যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তখন এনবিআরের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। টানা প্রায় দুই মাস রাজস্ব বিভাগে অচলাবস্থা তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে দেশের আমদানি–রপ্তানি ও ব্যবসা–বাণিজ্যে।
নীতি বিভাগ যদি পুরোপুরি পুরোনো আমলা বা মাঠপর্যায়ের আদায়কারী কর্মকর্তাদের হাতেই থাকে, তবে তাঁরা শুধু একটি জিনিসই বুঝবেন—কীভাবে দ্রুত টাকা তোলা যায়। তাঁরা নতুন করদাতা খোঁজার কষ্ট না করে পুরোনো ও সৎ ব্যবসায়ীদের ওপর নানা রকম বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেবেন।
অচলাবস্থা নিরসন ও কর্মকর্তাদের আন্দোলন দমাতে তৎকালীন সরকারও কঠোর অবস্থানে যায়; অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়, কাউকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাঁরা আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও তাঁদের কেউ কেউ সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা বলে পরিচিত ছিলেন।
পরে ক্ষোভের মুখে সরকার নিয়মে কিছু পরিবর্তন আনে। বর্তমান নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে ওই অধ্যাদেশ আইনে রূপ দেয়নি; বরং সংসদীয় কমিটির কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠিয়েছে। বিষয়টি এখন আইনি ও সংসদীয় পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে শোনা যাচ্ছে। সাময়িক বরখাস্ত করা কর্মকর্তাদের আবার চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
এই পুরো ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—দপ্তর বা বিভাগ আলাদা করে দিলেই কি করদাতাদের অভিযোগ কমে যাবে, কর আদায় রাতারাতি বেড়ে যাবে?
যিনি নিয়ম বানান, তিনি যদি মাঠের বাস্তবতা না জানেন, তবে আইন শুধু কাগজের পাতায় সুন্দর দেখাবে। আর যিনি কর আদায় করেন, তিনি যদি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ না বোঝেন, তবে রাজস্বের লোভে ব্যবসা–বাণিজ্যের চাকাটাই থমকে যেতে পারে। এই মৌলিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কর ব্যবস্থাপনার সংস্কার পরিকল্পনা করা হচ্ছে কি না, তা–ই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
কাঠামো ভাঙলেই কি সমাধান মিলবে
দেশে কর আদায়ের চিত্র বেশ হতাশাজনক। মোট অর্থনীতির আকারের তুলনায় যে পরিমাণ কর পাই (কর–জিডিপি অনুপাত), তা মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে আছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন।
সংস্কারবাদীরা বলেন, যিনি কর আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করবেন, তিনিই যদি করের নিয়ম বানান, তবে একধরনের ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি হয়। তখন কর্মকর্তারা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসার প্রসারের চেয়ে শুধু চলতি মাসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণেই বেশি ব্যস্ত থাকেন বা থাকবেন। যুক্তিটি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এটাও মনে রাখা জরুরি, নীতি ও প্রশাসনকে দুটি আলাদা ভবনে বসিয়ে দিলেই মানুষের কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দূর হয়ে যাবে না। রাজস্ব বাড়াতে দরকার অটোমেশন, করের আওতা বাড়ানো এবং সাধারণ করদাতাদের হয়রানিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করাও সমান জরুরি।
যদি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অর্থনৈতিক গবেষকদের দিয়ে নীতি বিভাগ চালানো হয়, তবে তাঁরা হয়তো আন্তর্জাতিক বই–পুস্তক পড়ে চমৎকার সব নিয়ম বানাবেন। কিন্তু দেশের বাস্তব অবস্থা, অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা কিংবা মাঠের হিসাব–নিকাশের সঙ্গে সেই নিয়মের কোনো মিল থাকবে না। এর ফলে নিয়ম বাস্তবায়নে গিয়ে যখন কর আদায় কম হবে, তখন আদায়কারী কর্মকর্তারা সহজেই অজুহাত দেবেন এই বলে, ‘নীতিমালাটি অবাস্তব ছিল, তাই আমরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারিনি’।
আসল চ্যালেঞ্জ ‘ম্যানিং: ডেস্কে বসবেন কারা’
সংস্কারের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে একটি জায়গায়—নীতি নির্ধারণের টেবিলে আসলে কারা বসবেন? এখানেই তৈরি হয় বড় দুটি বিপত্তি। প্রথমত শুধু গবেষক বা তাত্ত্বিকদের বসালে কী হবে? যদি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অর্থনৈতিক গবেষকদের দিয়ে নীতি বিভাগ চালানো হয়, তবে তাঁরা হয়তো আন্তর্জাতিক বই–পুস্তক পড়ে চমৎকার সব নিয়ম বানাবেন। কিন্তু দেশের বাস্তব অবস্থা, অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা কিংবা মাঠের হিসাব–নিকাশের সঙ্গে সেই নিয়মের কোনো মিল থাকবে না। এর ফলে নিয়ম বাস্তবায়নে গিয়ে যখন কর আদায় কম হবে, তখন আদায়কারী কর্মকর্তারা সহজেই অজুহাত দেবেন এই বলে, ‘নীতিমালাটি অবাস্তব ছিল, তাই আমরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারিনি’।
শুধু মাঠের কর কর্মকর্তা বসালে কী হবে
অন্যদিকে নীতি বিভাগ যদি পুরোপুরি পুরোনো আমলা বা মাঠপর্যায়ের আদায়কারী কর্মকর্তাদের হাতেই থাকে, তবে তাঁরা শুধু একটি জিনিসই বুঝবেন—কীভাবে দ্রুত টাকা তোলা যায়। তাঁরা নতুন করদাতা খোঁজার কষ্ট না করে পুরোনো ও সৎ ব্যবসায়ীদের ওপর নানা রকম বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেবেন। এতে সাময়িকভাবে রাজস্ব বাড়লেও শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
তবে উপায় কী
এই সংকটের কার্যকর সমাধান হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো, যেখানে অভিজ্ঞদের নিয়ে দল গঠন করা।
সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা কাউকে নীতি বিভাগে বসানো যাবে না। কারণ, তাঁদের মাঠের জটিলতা সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকে না। কর ও শুল্ক বিভাগে অন্তত ১০ বছর সততার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন—এমন পরীক্ষিত কর্মকর্তাদের স্বচ্ছ পরীক্ষার মাধ্যমে নীতি বিভাগে আনতে হবে।
একই সঙ্গে প্রশাসনে না ফেরার স্থায়ী নিয়মও করতে হবে। অর্থাৎ নীতি বিভাগে যোগ দেওয়ার পর কোনো কর্মকর্তা আর কখনো কর আদায়ের মাঠ প্রশাসনে ফিরে যেতে পারবেন না। যদি ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকে, তবে ভবিষ্যতে ভালো পোস্টিংয়ের লোভে তাঁরা পক্ষপাতমূলক নিয়ম বানাতে পারেন। তাই নীতি প্রণয়নকে তাঁদের স্থায়ী পেশা হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি এই কর্মকর্তাদের সহায়তা করার জন্য বেসরকারি বিশেষজ্ঞ ও উপদেষ্টাদের যুক্ত করা যেতে পারে। যেমন: বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ পেশাদার হিসাববিদ, আইনজীবী ও স্বাধীন অর্থনীতিবিদদের নিয়ে একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা দল রাখতে হবে। এতে সরকারি অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেসরকারি খাতের বাস্তব সমস্যার সঠিক মেলবন্ধন ঘটবে।
মনে রাখতে হবে, ‘সংস্কার মানে শুধু ভবনের নামফলক বদলানো নয়; আসল বিষয় হলো সঠিক চেয়ারে সঠিক মানুষকে বসানো।’
অন্য দেশ কী করছে
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, কোনো দেশই হুট করে রাতারাতি সব ভেঙে আলাদা করেনি। যেমন: ভারতে আয়কর ও শুল্কের আলাদা বোর্ড রয়েছে। তবে নীতি তৈরিতে যাতে কোনো একপেশে সিদ্ধান্ত না হয়, সে জন্য তারা ‘ট্যাক্স পলিসি রিসার্চ ইউনিট’ গঠন করেছে। সেখানে অভিজ্ঞ রাজস্ব কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ ও ডেটা গবেষকেরা একসঙ্গে কাজ করেন।
যুক্তরাজ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় করের নীতি নির্ধারণ করে এবং রাজস্ব বিভাগ তা বাস্তবায়ন করে। তবে তাদের কর্মকর্তারা যৌথ ডেস্কে বসে কাজ করেন, যাতে মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে নিয়মের কোনো ফারাক না থাকে।
আবার ভিয়েতনাম তাদের কর নীতি ব্যবসাবান্ধব করেছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কর আদায় সহজ করেছে, যার ফলে তাদের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
কাগজে–কলমে প্রতিষ্ঠান দ্বিখণ্ডিত করে দিলেই দেশের রাজস্ব খাতের ভাগ্য বদলে যাবে না। সংস্কারকে সফল করতে হলে চাই মাঠের বাস্তবতা জানা অভিজ্ঞ মানুষ, তাত্ত্বিক দূরদর্শিতার সমন্বয় এবং করদাতাদের জন্য একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে বলে মনে করি। সংসদীয় কমিটি যদি কর্মকর্তাদের কাজের অভিজ্ঞতা, স্বার্থের সংঘাত দূর করার নিশ্চয়তা এবং পেশাদারত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইনটি সাজাতে পারে, তবেই এই বহুপ্রতীক্ষিত সংস্কার সাধারণ মানুষ ও দেশের অর্থনীতির জন্য কার্যকর সুফল বয়ে আনবে।
লেখক: স্নেহাশীষ বড়ুয়া, এফসিএ, ডিরেক্টর, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড
