রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালানি নিরাপত্তায় ঐতিহাসিক মাইলফলক : বিজ্ঞান সচিব

প্রভাত রিপোর্ট: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে মন্তব্য করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, দেশের তরুণ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রবিবার (১৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) আয়োজনে বেসিক প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জন্য সময়োপযোগী ও প্রথম ধরনের উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ), বায়েরা, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বায়েক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ক্রিটিক্যালিটি ১১ অক্টোবর সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। শিগগিরই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে কেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, পারমাণবিক খাতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই শেষ কথা নয়; এর পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা সংস্কৃতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি একা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জনবলকে প্রশিক্ষিত ও সচেতন করে প্রাতিষ্ঠানিক এবং পরিচালনাগত—উভয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আইএইএর বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে। দ্বিধা বা সংকোচ না রেখে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ প্রশিক্ষণ দেশের পারমাণবিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের দক্ষতার প্রশংসা করে বিজ্ঞান সচিব বলেন, আইএইএসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ন্যায্য অবস্থান ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তিনি আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বায়েরা থেকে প্রতিবছর তিন থেকে পাঁচজন আন্তর্জাতিক মানের নিয়ন্ত্রক বিশেষজ্ঞ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এসব বিশেষজ্ঞ দেশের অভ্যন্তরীণ কাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গবেষণা সংস্থায়ও অবদান রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন বিজ্ঞান সচিব। এগুলো হলো—পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা, মানবসম্পদ ও পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে সেবা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি। বক্তব্য শেষে তিনি প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা, জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ১৯৯৮ সালে আইএইএ প্রণীত এ প্রশিক্ষণ কোর্স পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে কারিগরি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণে পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা, বিকিরণ সুরক্ষা, নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের নকশা, জ্বালানি চক্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীরা অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করে দেশে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও টেকসই পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবেন।
সভাপতির বক্তব্যে বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান আইএইএর প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য সংস্থাটিকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জাতীয় অগ্রাধিকার।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইএইএর টেকনিক্যাল অফিসার রাহিলা হাম্মাদ। চার সপ্তাহের এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে আইএইএর চার কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ—টেকনিক্যাল অফিসার রাহিলা হাম্মাদ, আইএইএ কর্মকর্তা বেনোইট গ্যাব্রিয়েল এবং বিশেষজ্ঞ মেহমেত তোম্বাকোগলু ও বারিস গুরনার প্রশিক্ষণ দেবেন। তাঁদের সঙ্গে দেশীয় বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরাও প্রশিক্ষক হিসেবে থাকবেন।
অনুষ্ঠানে বায়েরা, বায়েক ও নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) বিভিন্ন পর্যায়ের ৪০ জন নবীন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ১৮ অক্টোবর শুরু হওয়া বেসিক প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্সটি চলবে আগামী ১২ নভেম্বর পর্যন্ত।
More News Of This Category

