যুবসমাজ একটি রাষ্ট্র বা জাতির মস্তিষ্কস্বরূপ। মস্তিষ্কের সজীবতাই যেমন দেহকে সচল রাখে, তেমনি মেধাবী, ন্যায়নিষ্ঠ ও পরিশ্রমী যুবসমাজ রাষ্ট্র বা জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। এ কারণেই যুবসমাজের উৎকর্ষ মানে রাষ্ট্রের উৎকর্ষ, আর তাদের পরিচয় সংকট মানেই রাষ্ট্রের পরিচয় সংকট। বর্তমান যুগের তরুণ-কিশোররা নানা ধরনের মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে আত্মপরিচয় সংকট অন্যতম।
বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী, ৬০ থেকে ৭৯ শতাংশ তরুণ বা যুবক তাদের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগেন। প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসনের তথ্যানুযায়ী, ১২ থেকে ২৫ বছর বয়সটিই মূলত আত্মপরিচয় গঠনের মূল সময়। এই সময় যুবকদের মধ্যে ব্যাপক মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে। বর্তমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের এই সংকটকে আরও বেশি তীব্র করে তুলেছে।
ইন্টারনেটের এই যুগে হাজারো নকল মানদণ্ডের ভিড়ে নিজের আসল আত্মপরিচয় তৈরি করা তরুণদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এরই সঙ্গে নানা ধরনের ভ্রান্ত ও অপূর্ণাঙ্গ মতবাদের প্রসারের ফলে তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের আবিষ্কার করছে সত্য থেকে আরও দূরে। এছাড়া আত্মপরিচয় গঠনে কোন মানদণ্ড অনুসারে যুবসমাজ কোন চিন্তাধারা গ্রহণ করবে, আর কোনটি বর্জন করবে তা নিয়ে তারা এক চরম সংকটে ভুগছে।
এজন্য আজকের এই যুগে যুবকদের পক্ষে পরিচয় সংকট কাটিয়ে শক্তিশালী আত্মপরিচয় গঠন করা আপাতদৃষ্টিতে অনেক কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু আশার বাণী হলো, ইসলামের শাশ্বত জীবনব্যবস্থা এই সংকট উত্তরণে এক যুগান্তকারী পন্থা আমাদের সামনে উপস্থাপন করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে ধূসর মরুভূমির মাঝে ইতিহাসের সবচেয়ে আদর্শবান জাতির সূচনা ঘটিয়ে আরব পৌত্তলিকদের সন্তানদের উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনি আজও সেই পথ অবলম্বন করে একবিংশ শতকের এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারবিয়াত বা মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক গঠনপদ্ধতি তরুণ সাহাবিদের অন্তরে এমন এক অটল আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল, যা তাদের যুগের সব সামাজিক ও মানসিক সংকটকে জয় করতে শিখিয়েছিল।
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন তার প্রিয় সাহাবারা। যাদের মধ্যে মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) অন্যতম। মুসআব বিন উমায়ের (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে মক্কার কুরাইশদের মধ্যে অন্যতম ধনী, সুদর্শন ও অভিজাত তরুণ ছিলেন। বিলাসবহুল জীবনযাপনই ছিল তার সামাজিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তার মা ও গোত্র তাকে বর্জন করে, তার সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেয় এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ফলে তার বাহ্যিক পরিচয়ে আমূল পরিবর্তন আসে।
কিন্তু তিনি এতে ভেঙে পড়েননি বরং নিজের মুসলিম পরিচয়কে জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। পুরোনো বংশমর্যাদা ও বিলাসী পরিচয়ের পরিবর্তে ‘আল্লাহর বান্দা’ ও ‘রাসুলের অনুসারী’ পরিচয়কে তিনি শ্রেষ্ঠ মনে করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মদিনার প্রথম দূত হিসেবে এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন।
একইভাবে আলী (রা.) মাত্র ১০ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করে কিশোর ও তরুণদের জন্য এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। চরম প্রতিকূল পরিবেশেও তার সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা প্রমাণ করে যে, বয়স কখনো সঠিক আত্মপরিচয় ও আদর্শ ধারণ করার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না। অন্যদিকে, উসামা বিন জায়েদ (রা.) মাত্র ১৮ বছর বয়সে রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে এক বিশাল সেনাবাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব লাভ করেন।
রোমান সাম্রাজ্যের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে সাহাবিদের মতো প্রবীণ ও অভিজ্ঞ দলের নেতৃত্ব দেওয়া তার ওপর রাসুল (সা.)-এর অগাধ আস্থা এবং ইসলামের যুববান্ধব নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। সাহাবিদের এই সোনালি ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, আত্মপরিচয়ের প্রকৃত ভিত্তি কোনো ঠুনকো সামাজিক অবস্থান বা ইন্টারনেটের ভুয়া ট্রেন্ড কিংবা বৈষয়িক চাকচিক্য নয়। এর মূল ভিত্তি হলো মহান সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং নিজের পরিচয়ের প্রথম ভিত্তি মুসলিম নির্ধারণ করা।
লেখক: শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
