হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। গত শুক্রবার থেকে এ প্রণালির আশপাশে এবং সৌদি আরবের উপকূলীয় এলাকায় অন্তত চারটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি ট্যাংকারে ছোট নৌযান থেকে ছোড়া রকেটচালিত গ্রেনেড (আরপিজি) আঘাত হেনেছে। এ ছাড়া ইয়েমেনের আল-মুকাল্লা উপকূলের কাছে পঞ্চম একটি ট্যাংকার লক্ষ্য করে বন্দুকধারীরা গুলি চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা (ইউকেএমটিও)।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কার্যকর অবরোধের কারণে ইরানের কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, কাতারের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে তেহরান। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
একই সময়ে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা ও সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির তাইজ গভর্নরেটের একটি গ্রামে হুথিদের হামলায় অন্তত আট বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে সরকারপন্থি সংবাদ সংস্থা সাবা। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। অন্যদিকে তাইজের দক্ষিণে শাকাব ফ্রন্টে হুথিদের একটি হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সশস্ত্র বাহিনী। এ ছাড়া সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ তিনটি অঞ্চলে চারটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিভিন্ন দেশের জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ বলে আবারও ঘোষণা দিয়েছে আইআরজিসির নৌবাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের জাহাজ এ প্রণালি দিয়ে চলাচল নিষিদ্ধ।
আইআরজিসির নৌবাহিনী আরও হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিধিনিষেধ অমান্য করা জাহাজের পরিণতি হবে আগুনে পুড়ে যাওয়া। এ বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করেছে ইরানি নৌবাহিনী। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে একটি নৌমাইনে আঘাত লেগে একটি সুপারট্যাংকারে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
গত শুক্রবার থেকে ট্যাংকারে হামলার একাধিক খবর পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের জুবাইল বন্দরের উত্তর-পূর্বে প্রায় ৭৮ নটিক্যাল মাইল বা ১৪৫ কিলোমিটার দূরে একটি ট্যাংকারে ছোট নৌযান থেকে রকেটচালিত গ্রেনেড ছোড়া হয়। ইউকেএমটিওর তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৭টা ২২ মিনিটে এ হামলা চালানো হয়।
হামলায় জাহাজটির পেছনের বাম পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জাহাজের সব নাবিক নিরাপদে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এবং পরিবেশের ওপর হামলার প্রভাব সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে সৌদি আরবের উপকূলের কাছে গতকাল থেকে অন্তত আরও দুটি ট্যাংকারে হামলার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে গত শুক্রবার থেকে অন্তত চারটি ট্যাংকারে হামলার তথ্য সামনে এসেছে। ইয়েমেনের আল-মুকাল্লা উপকূলের কাছে পঞ্চম একটি ট্যাংকার লক্ষ্য করে বন্দুকধারীরা গুলি চালিয়েছে বলেও জানিয়েছে ইউকেএমটিও।
তবে এসব হামলার জন্য কারা দায়ী, সে বিষয়ে সরবরাহ করা তথ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো দায় স্বীকার বা নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কার্যকর অবরোধের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। ওয়াশিংটনের এ অবস্থানের বিপরীতে তেহরান প্রণালিটি বন্ধ রাখার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিসহ উন্নত প্রযুক্তিতে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেশটির মানবসম্পদ ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের কাছে ইসলামশাহরে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, বর্তমান অবস্থার চেয়েও অনেক ভালো অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব, যাতে কোনো শত্রু ইরানে হামলা চালানোর সাহস না পায়। এ লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে শিক্ষার মৌলিক ভূমিকা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ইয়েমেনের হুথিদের ক্রমবর্ধমান হামলার মধ্যে সৌদি আরবকে রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে গত রবিবার জরুরি অধিবেশনে বসছে মিসরের পার্লামেন্ট। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন চাওয়ার পর এ অধিবেশন আহ্বান করা হয়।
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ গভর্নরেটে হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় অন্তত আট বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। সরকারপন্থি সংবাদ সংস্থা সাবা স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মাকবানাহ জেলার হিময়ার আল-জাবাল এলাকার আল-মাকদি গ্রামে এ হামলা চালানো হয়। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। হতাহতের এ সংখ্যা প্রাথমিক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে তাইজ শহরে হুথিদের হামলায় তিন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং পাঁচজন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল শহরটির অবরোধবিষয়ক কার্যালয়। গভর্নরেটজুড়ে তীব্র লড়াই চলার মধ্যেই এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাইজ গভর্নরেটের দক্ষিণে শাকাব ফ্রন্টে হুথিদের একটি হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে এ হামলা প্রতিহত করা হয়। সরকারি বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একই সময়ে যুদ্ধবিমান দিয়ে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছিল।
