প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, শিক্ষক, শিল্প-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সাধক যোগেন চৌধুরী আর নেই। রবিবার সকালে কলকাতার রুবি জেনারেল হাসপাতালে ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বভারতীর কলাভবন ও শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। তাঁর প্রয়াণে একদিকে যেমন ভারতীয় শিল্পজগতে তৈরি হল অপূরণীয় শূন্যতা, তেমনই শান্তিনিকেতন হারাল এক প্রিয় মানুষকে। যাঁর কাছে শিল্পচর্চা কেবল ক্যানভাসে রং-তুলির খেলা ছিল না, ছিল সমাজ, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতারও প্রকাশ।
১৯৮৭ সালে বিশ্বভারতীর কলাভবনে চিত্রকলার রিডার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। পরে অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের দায়িত্বও সামলেছেন। তাঁর নিজস্ব অঙ্কনশৈলী, বিশেষত কালি ও তুলির অসামান্য প্রয়োগ, তাঁকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলায় স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছিল। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি শুধু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন শিক্ষক, অভিভাবক ও নির্ভরতার আশ্রয়। অবসরের পরেও শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। এই মাটির সঙ্গে, এখানকার মানুষের সঙ্গে, এখানকার শিল্পচর্চার সঙ্গে তাঁর বন্ধন থেকে গিয়েছিল আজীবন। কলাভবনের অধ্যক্ষ শিশির শাহানার কথায়, ‘‘তাঁর নিজস্ব অঙ্কনশৈলী, বিশেষ করে কালি ও তুলির নিখুঁত ব্যবহার তাঁকে আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পীদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র জায়গা করে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চের এই জনপ্রিয় চিত্রশিল্পীর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে এক বিরাট যুগের অবসান ঘটল।’’ বিশ্বভারতীর শিল্পসদনের অধ্যাপক আশিস ঘোষের কাছে যোগেন চৌধুরী ছিলেন ‘যোগেনদা’, একই সঙ্গে প্রিয় মাস্টারমশাই। কলাভবনে পড়ার সময় তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছিল। চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় অর্থের অভাবে অস্ট্রিয়া যাওয়ার সুযোগ যখন প্রায় হাতছাড়া হতে বসেছিল, তখন নিজের উদ্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। আশিস ঘোষের কথায়, একজন শিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যাপক পঙ্কজ পানোয়ারের কাছেও এই প্রয়াণ ব্যক্তিগত শোকের। প্রায় তিন দশক সহকর্মী হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন। শিখেছেন তাঁর কাছ থেকেও। প্রবীণ আশ্রমিক ও ঠাকুর পরিবারের সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, “খুবই অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন। বড় মাপের শিল্পী ছিলেন, আমার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। তার এভাবে চলে যাওয়া অনেকখানি ক্ষতি হয়ে গেল।” কলাভবনের প্রাক্তন কিউরেটর সুশোভন অধিকারীর কথায়, এই প্রয়াণ শিল্পজগতের ‘ইন্দ্রপতন’। পদ্মভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত এই শিল্পীর মৃত্যুতে ভারতীয় শিল্পজগতে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।” বিশ্বভারতীর কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যাপক জনক ঝংকার নার্জারি বলেন,” পদ্মভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত এই শিল্পীর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হল।” তবে ক্যানভাসের বাইরেও ছিল তাঁর লড়াই।
শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি, খোয়াইয়ের ভূপ্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নে বরাবর সরব ছিলেন যোগেন চৌধুরী। খোয়াই অঞ্চলে বহুতল নির্মাণের প্রতিবাদে স্থানীয়দের সঙ্গে আন্দোলনে নেমেছিলেন তিনি। বল্লভপুরের কাছে খোয়াই-সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলার আবেদনকারীদের মধ্যেও ছিলেন। তাঁর প্রতিবাদের কেন্দ্রে ছিল শান্তিনিকেতনের স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার দাবি। সেই আন্দোলন ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদের একাধিক মৌজায় বহুতল নির্মাণ আটকে যায়। বিশ্বভারতীর সঙ্গে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের জমি-বিতর্কের সময়েও অমর্ত্য সেনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে তাঁর বাড়ি ‘প্রতীচী’র কাছে প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও যোগ দেন।
শান্তিনিকেতনে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের আর এক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা সোনাঝুরি সংলগ্ন শ্যামবাটির ‘স্বাদ’ শিল্পকেন্দ্র। শিল্পচর্চা, প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীন পরিসর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে নিজের শিল্পকর্ম সৃষ্টির পাশাপাশি শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য তৈরি করেছিলেন এক মুক্ত পরিসর। গত ১৫ বছর ধরে ওই শিল্পকেন্দ্রে পরিচারিকার কাজ করছেন কালিন্দী টুডু। তাঁর কণ্ঠেও ঝরে পড়েছে শোক। তিনি বলেন, “শেষ দেখা হল না। শান্তিনিকেতনে এল না তাঁর দেহ। অথচ এই জায়গাটিকে কতটা ভালোবাসতেন তিনি ! হাতে রং-তুলি নিয়েই কথা বলতেন, সকলের খোঁজখবর নিতেন। এখানে বসেই তৈরি করতেন নানা শিল্পকর্ম। এত তাড়াতাড়ি বাবু চলে যাবেন, ভাবতে পারিনি।’’ বিশ্বভারতীর জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ বলেন, “যোগেন চৌধুরীর মৃত্যুতে বিশ্বভারতীর সব স্তরেই শোকের আবহ। ছুটির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন করা সম্ভব না হলেও, বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিক হলে শান্তিনিকেতনের উপাসনাগৃহে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ মন্দিরের আয়োজন করা হবে।” ক্যানভাসে তাঁর আঁকা ছবি থেকে যাবে, থেকে যাবে ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিতে তাঁর স্নেহের স্পর্শ। খোয়াইয়ের বাতাসে, শ্যামবাটির ‘স্বাদ’ শিল্পকেন্দ্রে, কলাভবনের অলিন্দে অলিন্দে যেন থেকে যাবে তাঁর পদচিহ্ন। মানুষটি চলে গেলেন, কিন্তু রং-তুলির আঁচড়ে আর মানুষের হৃদয়ে যে শান্তিনিকেতনকে তিনি ভালোবেসেছিলেন, সেখানেই অমর হয়ে রইলেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর প্রয়াণে আজ শোকাহত শান্তিনিকেতন, স্তব্ধ শিল্পের আঙিনা।
