দ্বিতীয় সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলেজ স্কোয়্যারছবি: শুভ্রজিৎ চন্দ্র
Published on
:
2 min read
সপ্তমীতেই বিসর্জনের সুর। আলোর মালা, নতুন জামা-জুতো সবই আছে, তার পরেও যেন তাল কেটে গিয়েছে কোথাও। শনিবার রাতে চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুই এক লহমায় মুছে দিয়েছে সব আনন্দ। কলকাতা থেকে জেলা — সর্বত্রই একই ছবি। কলকাতার একাধিক বড় পুজো মণ্ডপই চোরবাগান সর্বজনীনের পাশে দাঁড়িয়েছে। কোথাও বাতিল করা হয়েছে সমস্ত আনন্দ-অনুষ্ঠান। কোথাও আবার কিছুক্ষণের জন্য আলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুজো কমিটি। জেলার একাধিক পুজোও বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। সেটা অবশ্য নিরাপত্তার স্বার্থে।
চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্টের ঘটনার পরেই কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে করে দেওয়া হয়েছিল কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পুজো বলে পরিচিত চেতলা অগ্রণী। তবে রবিবার ফের চালু হয়েছে। দর্শনার্থীরাও আসছেন। তবে ভিড়ে যাতে কারও অসুবিধা না হয়, তার জন্য এক্সিট গেটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে জানানেন পুজো কমিটির সদস্য সব্যসাচী রায় চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘সিপি নিজে এসে ঘুরে গিয়েছেন। তাঁর নির্দেশ মতোই চলছি।’ মোতায়েন রয়েছে প্রচুর পুলিশও।
চোরবাগানের ঘটনার পরে পুজোর রেশ যে অনেকটাই ম্লান, তাতে সন্দেহ নেই। তাই সমস্ত আনন্দ-অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে টালা বারোয়ারি। এ দিন ফেসবুক পোস্টে তারা লিখেছে, ‘চোরবাগানের ঘটনায় আমরা মর্মাহত। সমস্ত আনন্দ-অনুষ্ঠান বাতিল করা হলো।’ তবে দর্শকদের আবেগ আর পুজোর জন্য বাঙালির সারা বছরের অপেক্ষাকে মাথায় রেখে মণ্ডপ খোলা রাখা হচ্ছে বলেই জানিয়েছে তারা।
চেতলা অগ্রণীর মতো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল টালা প্রত্যয়ের পুজোও। তবে এ দিন ফের মণ্ডপ খুলে দেওয়া হয়েছে বলে একটি ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে পুজো কমিটি। তারা লিখেছে, ‘টালা প্রত্যয়ের মণ্ডপ আবার খুলে দেওয়া হয়েছে। গতকালের অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত।’ তবে অ্যালেন পার্কের লেজ়ার শো ফের চালু করার কোনও খবর মেলেনি। এ বারেই প্রথম বিজেপি নেতা শঙ্কুদেব পণ্ডা এখানে পুজো করছেন। চোরবাগানের দুর্ঘটনার পরেই লেজ়ার শো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের পুজো নিয়ে বরাবরই আলাদা আবেগ থাকে বাঙালির। এই পুজোর উদ্যোক্তা বিজেপি নেতা সজল ঘোষ। চোরবাগানের ঘটনার পরেই ভিড়ে রাশ টানা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। রাতেই ভিডিয়ো বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, ‘অনুরোধ করছি, যাঁরা আসছেন ফিরে যান।’ তবে এ দিন মণ্ডপ খোলাই রয়েছে। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-ও চলছে। নিজের ফেসবুক লাইভে তা শেয়ারও করেছেন সজল।
অন্য দিকে, অষ্টমী পুজো ও সন্ধিপুজোর সময় দর্শনার্থীদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে মুদিয়ালি ক্লাব। আবার রাত সাড়ে ৮টায় পুজো মণ্ডপের সমস্ত আলো বন্ধ রাখছে চিনার পার্ক অধিবাসী বৃন্দ। মোমবাতি এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করা হবে বলে জানিয়েছে তারা।
তবে জেলার বেশ কিছু পুজো একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হুগলির শ্রীরামপুরের নেহেরু নগর সর্বজনীনের পুজো। কৈলাসের আকারে সাজানো হয়েছিল ৭০ ফুটের মণ্ডপ। পঞ্চমী থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল ভিড়। এ দিন মণ্ডপ পরিদর্শনে যান জেলার পুলিশ কর্তারা। তার পরেই বন্ধ করে দেওয়া হয় মণ্ডপ। চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে বৈদ্যবাটির শ্রীপর্ণা পোদ্দারের। শোকের ছায়া গোটা এলাকায়। বৈদ্যবাটির সমস্ত পুজোয় মাইক বাজানোও বন্ধ রাখা হয়েছে।
অ্যকশন মোডে রয়েছে বর্ধমান পুলিশও। এ দিন সকাল থেকেই জেলার একাধিক মণ্ডপে হানা দেন পুলিশ কর্মীরা। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কোথাও বিজ্ঞাপনের গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও চওড়া করে দেওয়া হয়েছে এক্সিট গেট। হুঁশিয়ারির সুরে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নির্দেশ না মানলে কড়া ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।
দ্বিতীয় সপ্তমীতেও ঢাক বাজছে। মানুষও নেমেছে রাস্তায়। আলোর মালা, নতুন জামা-জুতো সবই আছে, তবে কোথায় যেন তাল কেটে গিয়েছে। অনেকেরই দাবি, সেই ভিড় নেই। রাস্তা ফাঁকা। প্যান্ডেল হপিং, ঠাকুর দেখা, খাওয়া-দাওয়া সবই হচ্ছে, কিন্তু সবই যেন যন্ত্রবৎ। কোথাও যেন বয়ে চলেছে বিষাদের সুর। প্রথম সপ্তমীতে চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্টের ঘটনাতেই যেন এ বারের পুজোর বিসর্জন হয়ে গিয়েছে।
