তালিকায় জাপা নেতা, এমপির ভাতিজার স্ত্রী ও বিএনপি নেতার স্বজন
কিশোরগঞ্জে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগের অনুমোদিত তালিকা ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতা, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলামের ভাতিজার স্ত্রী ও মামাতো ভাই এবং উপজেলা বিএনপির নেতাদের স্বজনদের নাম রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে সমালোচনা।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি ও বিএনপির কয়েকজন নেতার পছন্দের ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এমনকি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কয়েকজনের নাম সুপারিশ করা এবং জেলা পর্যায়ে তালিকার ক্রমিক পরিবর্তন করে তাঁদের অবস্থান এগিয়ে আনার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুমোদিত তালিকা অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলামের ভাতিজা তারিকুল হক তারেকের স্ত্রী রোকসানা আফরোজ। গাড়াগ্রাম ইউনিয়নে মেসার্স মোমেনা ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন ফজলে রাব্বী, যিনি তারেকের মামাতো ভাই বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক একেএম তাজুল ইসলাম ডালিমের বাবা আফসার আলী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ইবনে সাঈদ সুজনের স্ত্রী বিথী আক্তারের নামও তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে, বাহাগিলী ইউনিয়নের জাপা নেতা জাহেদুল হকও ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁকে ডিলার নিয়োগে সুপারিশ করার জন্য ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, পুটিমারী, মাগুড়া, গাড়াগ্রাম ও বড়ভিটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ-সমর্থক পরিবারের সদস্যদের ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে একটি সিন্ডিকেট প্রতি ডিলারের কাছ থেকে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
তালিকার ক্রমিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় রোকসানা আফরোজের নাম দ্বিতীয় ক্রমিকে থাকলেও জেলা পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে প্রথম করা হয়েছে। একইভাবে বাহাগিলী ইউনিয়নের জাপা নেতা জাহেদুল হকের নাম উপজেলা পর্যায়ের তালিকায় তৃতীয় ক্রমিকে থাকলেও জেলা পর্যায়ে তাঁকে প্রথম ক্রমিকে আনার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে সাংগঠনিক পদ হারানো এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে চাইছেন না বলে দাবি করেছেন স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন নেতাকর্মী। উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম দুলু ফেসবুকে লিখেছেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীকে দলীয়ভাবে মনোনীত করবেন কারা, সারের ডিলারগণ? নাকি তাদের সুপারিশকারী?”
কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিনারুল ইসলাম তাঁর ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেও তাঁরা সহযোগিতা পাননি। তাঁর দাবি, তাঁদের ইউনিয়ন বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মাগুড়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি এম এ হান্নান সরকার অভিযোগ করে বলেন, “আমার মাগুড়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগপন্থী লোককে সারের ডিলারশিপ দিয়ে প্রায় ২২ লাখ টাকা সিন্ডিকেট করে হাতিয়ে নিয়েছে।”
বাহাগিলী ইউনিয়ন বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক নুরনবী ইসলাম বলেন, “আমার সব ধরনের ব্যবসায়িক যোগ্যতা থাকার পরও আমাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা এই বেআইনি ডিলার সুপারিশের তালিকা অবিলম্বে বাতিল করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিমলার একাধিক ব্যবসায়ীও অর্থের বিনিময়ে সার ডিলার নিয়োগের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, তালিকাটি বাতিল করে নিরপেক্ষভাবে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ দিতে হবে।
সার ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কৃষি উপকরণ বিতরণব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, তালিকার ক্রমিক পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান এবং ডিলার নির্বাচনের নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
