বলিউডের অভিনেতা টাইগার শ্রফকে হত্যাচেষ্টায় জড়িতদের একটি ছবি সামনে এসেছে, প্রকাশ হয়েছে হামলার সময়ের কয়েকটি ভিডিও। উঠে এসেছে প্রতক্ষ্যদর্শীদের বয়ান। হামলাকারীদের ধরতে তল্লাশি জোরদার করেছে মুম্বাই পুলিশ।
পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া এনডিটিভি সেই ছবি তুলে ধরেছে খবরে। যেখানে দুই তরুণকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়; তাদের পরনে সাদা শার্ট এবং একজনের মাথায় ‘পুমা’ লোগো লাগানো কালো টুপি।
মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে রোববার সন্ধ্যায়। এ ঘটনায় তিনি অক্ষত আছেন। একটি ফুটবল মাঠ থেকে বের হওয়ার সময় হামলার মুখে পড়েন টাইগার। মোটরসাইকেলে আসা তিন ব্যক্তি গুলি চালান।
এ ঘটনায় টাইগারের গাড়ি চালক ও কাছাকাছি থাকা একজন অটো চালক আহত হয়েছেন।
অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের ছেলে টাইগারের উপর হামলার মুহূর্তের যে কয়েকটি ভিডিও সামনে এসেছে, যেগুলোতে দেখা যাচ্ছে, টাইগার হামলাকারীদের ঠিক কতটা কাছে ছিলেন। এনডিটিভি জানিয়েছে, টাইগার গাড়ির যে পাশে বসেছিলেন, ঠিক সেই পাশেই কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়।
Visuals show blood stains on Tiger Shroff's car after firing in Mumbai's Juhu, actor seen taking the wheel and driving off moments after the attack. https://t.co/pLFfgoimyh
— NDTV (@ndtv) October 18, 2026
দুই বন্দুকধারী গাড়িটি লক্ষ্য করে পাঁচটি গুলি ছোড়ে। এরপর দেখা যায় তাদের একজনের বন্দুক আর কাজ করছে না। এরপর গাড়ি থেকে গুলিবিদ্ধ চালক বের হয়ে আসতেই, আগে থেকেই ঠিক করে রাখা একটি বাইকে করে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
গুলি চালানোর কিছুক্ষণ পরেই টাইগার তার বিএমডব্লিউ সেডানের চালকের আসনে বসে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেন। চিকিৎসার জন্য আহত গাড়ি চালক ফেরদৌস এবং চৌহান নামের অটো চালককে নিয়ে দ্রুত নানাবতী হাসপাতালের রাস্তা ধরেন। এ সময় রাস্তায় রক্তের ছোপ দেখা গেছে ভিডিওতে। টাইগারের হাতে ও বুকেও কিছুটা আঘাত লাগে।
টাইগার শ্রফ বলিউডের এক সময়কার জনপ্রিয় অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের ছেলে। অভিনয়ের পাশাপাশি টাইগার পেশাদার মার্শাল আর্ট শিল্পী হিসেবেও পরিচিত। চমৎকৃত নাচের জন্যও তিনি জনপ্রিয়।
নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন
হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জুহু পুলিশ তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে। মুম্বাই পুলিশ ও ক্রাইম ব্রাঞ্চের যৌথ উদ্যোগে ১৫টি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করেছে ফরেনসিক দল।
নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসনও। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরে দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ অভিযুক্তদের খুঁজে বের করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন; এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী টাইগারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে টাইগারের বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে দেখাও করেছেন ।
হামলাকারীদের বাইক উদ্ধার
হামলাকারীরা তাদের বাইকটি আন্ধেরি রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে ফেলে পালিয়ে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। মুম্বাইয়ে নিবন্ধন করা ওই গাড়ির নম্বর নম্বর প্লেট, চেসিস এবং ইঞ্জিনের নম্বর খতিয়ে দেখে মালিকের সন্ধান চলছে।
আন্ধেরি স্টেশন থেকে হামলকারীরা কোন দিকে পালিয়েছে, তা শনাক্ত করতে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
Visuals show blood stains on Tiger Shroff's car after firing in Mumbai's Juhu, actor seen taking the wheel and driving off moments after the attack. https://t.co/pLFfgoimyh
— NDTV (@ndtv) October 18, 2026
যেহেতু অভিযুক্তরা হামলার পর গণপরিবহন ব্যবহার করেছিল বলে মনে করা হচ্ছে, তাই মুম্বাই পুলিশ ট্রেন ও বাসেও তল্লাশি চালিয়েছে। মুম্বাই থেকে ছেড়ে যাওয়া সরকারি ও বেসরকারি বাসগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে; পাশাপাশি মুম্বাই থেকে অন্যান্য রাজ্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতেও তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ টাইগারের চালকের জবানবন্দিও নিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে যা এসেছে
প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি শাহরুখ শেখ বলেন স্টেডিয়ামের ওই রাস্তায় সে সময় অস্বাভাবিক কোনো কিছু তার চোখে পড়েনি।
তিনি বলেন, “আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম। তাদের (হামলাকারীদের) মুখ মনে নেই, কারণ ঘটনাটা এত হঠাৎ ঘটেছিল যে, আমি ব্যাপারটা বুঝে উঠতেই পারিনি; ভয় পেয়ে গেছিলাম।
“কারণ, হঠাৎ করেই চারটি গুলি চালানো হয়েছিল। কি হয়ে গেল-এটাই মনে হচ্ছিল।”
তিনি বলেন, গাড়িতে ওঠার আগে অভিনেতা সেখানে থাকা মানুষদের সঙ্গে হাত মেলান, আমরা ছবি তুলি।
"কিন্তু গাড়িটি স্টেডিয়ামের গেইট পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীরা গুলি চালাতে শুরু করে।"
হামলার দায় স্বীকার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং।
হামলার ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি অডিও বার্তা সামনে আসে, যেখানে এক ব্যক্তিকে হিন্দিতে বলতে শোনা যায়, “আমি অনিল পণ্ডিত। আমি লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ছোট ভাইয়ের মত। টাইগার শ্রফের সাথে আজ যা ঘটেছে, তার দায় আমি ও হারমান সান্ধু নিচ্ছি। টাইগার শ্রফকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে আমাদের কথা বুঝতে চায়নি।
“পুরো চলচ্চিত্র শিল্পে যেই আমাদের সাথে তাল না মিলিয়ে কাজ করবে, কিংবা সালমন খানের সঙ্গে কাজ করবে, তাকেই হত্যা করা হবে। এটিই প্রথম এবং শেষ সতর্কতা।”
অডিও বার্তায় সতর্কবার্তাটির পুনরাবৃত্তি করে বলা হয়, “সালমান খান যদি লরেন্স এবং পশুপ্রেমী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা না চান, তবে আমরা তোমার পরিবারের কাউকেই রেহাই দেব না, এমনকি তোমাদের পোষা কুকুরকেও না।”
এনডিটিভি বলছে, টাইগার এবং সালমান খান একসঙ্গে কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও, তাদের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ২০১২ সালে বলিউড প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার ‘হিরাপান্তি’ সিনেমায় প্রথম নায়ক হিসেবে টাইগার বলিউডে তার যাত্রা শুরু করেন।
শোনা যায়, সালমানই মূলত নাদিয়াদওয়ালাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন টাইগারকে সিনেমায় নেওয়ার। টাইগার শ্রফের বাবা জ্যাকি শ্রফ একাধিক চলচ্চিত্রে সালমান খানের সঙ্গে কাজ করেছেন।
ভারতের রাজস্থানের প্রভাবশালী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সালমানের বিরোধ অনেক পুরনো। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে শুটিং করতে গিয়ে সালমান খান দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যা করেন। বিরল প্রজাতির এই হরিণকে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করে। এরপরই সালমানের বিরুদ্ধে মামলা করে বিষ্ণোই সম্প্রদায়। এ মামলায় ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের জেলও হয় সালমানের। পরে অবশ্য জামিনে মুক্তি পান তিনি।
কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাওয়ায় বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সদস্য সন্ত্রাসী লরেন্স বিষ্ণোই সালমআনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। এরপর একাধিকবার সালমান ও তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের ওপর হামলার চেষ্টা করে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং।
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার আগে সালমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মহারাষ্ট্রের সাবেক মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকীকে গুলি করে হত্যা করে বিষ্ণোই গ্যাং।
