সরকারের নির্বাচন কমিশন নামে একটা শ্বেত হস্তী আছে, আপনারা কি জানেন? প্রায়শ এই প্রতিষ্ঠানটি বয়স্ক মানুষের মতো মাঝে মাঝে ভুলভাল কার্যক্রম করে বসে! গেল মাসের কথা। উরু ধুরু নির্বাচন কমিশন খুব কুৎসিতভাবে গ্যাঁড়াকলে পড়ে। এই নির্বাচন কমিশন সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রাথমিক তারিখ ঘোষণা করে, বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে।
এক নম্বর জটিলতা :
বিএনপি চেয়ারপার্সন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী সদ্যপ্রয়াত আপোশহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিন আগামী ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৬ তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে।
দ্বিতীয় নম্বর জটিলতা :
ইউনিয়ন পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের তারিখ ১৩ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা। আগামী ১৩ ডিসেম্বর রয়েছে সারা দেশব্যাপী জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার দিন। মজার ব্যাপার, এসব সময় বা মুহূর্ত কোনো আমলে না নিয়েই একতরফাভাবে নির্বাচন কমিশন ঐদিন দু’টিতে ইউনিয়ন পরিষদ ভোটের দিন নির্ধারণ করে। অবশেষে নিজের ভুল বুঝতে পেরে নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থান হুট করে আবার পরিবর্তন করে!
জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে নির্বাচন কমিশন তুঘলকি এসব কাণ্ড জন্ম দেওয়ার মূল কারণ কী? একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় টায়ার অফ গভর্নমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ক্ষেত্রে যদি এত দেউলিয়া এবং উদাসীন থাকে, তাহলে তারা ওই প্রতিষ্ঠানে আসলে করেটা কী? গেল ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন এই আলা-ঝালা কাজটি বেশ দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করে। নির্বাচন কমিশন ঘোষণার সময় জানায়—সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ। ১৪ সেপ্টেম্বর এই ঘোষণা দেওয়ার একদিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দু’জন ডাকসাইটে ব্যক্তি!
বিশেষ মজার ব্যাপারেই যে, নিজেরা স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, এ ধরনের হামবড়া ভাব দেখাতে গিয়ে, কঠিনভাবে ধরা খেয়েছে। সরকারের সাথে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়া, কোনো প্রকার যোগাযোগ ছাড়া নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণায় ইসির এক্তিয়ার নিয়ে দারুণভাবে প্রশ্ন ওঠে। ওই পর্যন্ত শেষ হলে কোনো কিছু লেখার আর দরকার হতো না। তবে এ ধরনের কাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দারুণ হইচই পড়ে যায়। সরকার বনাম নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়হীনতা নিয়ে নানা ধরনের কথাও উঠে। সমালোচনা, নিন্দা এবং নির্বাচন কমিশনের অদূরদর্শী আচরণে অনেকেই ক্ষুব্ধ এবং বিস্মিত হন! বাপরে বাপ-এ কেমন নির্বাচন কমিশন? জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনের কোনো খোঁজ খবর রাখে না! একটা কিছু দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে পারলেই হলো। পরে অবশ্য নির্বাচন কমিশন ১৭ সেপ্টেম্বর আন্ত মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর গণ সমালোচনার মুখে বেশ টনক নড়ে। ঘোষণাটি দেখে সরকারের উপদেষ্টা ও মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রীরা খোলামেলা কঠিন বক্তব্য দেওয়ায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে এই উদাসীন স্বভাবের নির্বাচন কমিশন।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় স্পষ্টই বলে ফেলে—সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনে গাঁজাখুরি কর্মকাণ্ড প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়। নির্বাচন কমিশনে অর্বাচীন সদস্যদের ভুল ও অদূরদর্শিতা জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এই ঘটনার পর উপদেষ্টা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী তাদের প্রতিক্রিয়া কঠিন ভাবে ব্যক্ত করে যেভাবে বক্তব্য দেন তা অবশ্য নির্বাচন কমিশনের জন্য ছিল দারুণ অসম্মানজনক।
কোনো কিছু কওয়া নেই ১৪ সেপ্টেম্বর একতরফাভাবে ইসি অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করে সাত ধাপে তড়িঘড়ি নির্বাচনের দিন ঘোষণা করে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী সাতটি ধাপ ছিল এরকম—সম্ভাব্য ভোটের প্রথম ধাপের তারিখ বলা হয় ১২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় ধাপের তারিখ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ ২০২৭ সালের ওই জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৭, ষষ্ঠ ধাপ ২০২৭ সালে ২২ এপ্রিল, এবং সর্বশেষ সপ্তম ধাপ নির্ধারণ করা হয় ২০২৭ সালের ২৭ মে। অথচ সারা দেশব্যাপী জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৮, ১০, ১৩ ও ১৫ ডিসেম্বর। মজার ব্যাপার ১৩ ডিসেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের গণিত পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিমত, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হয়। আবার ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে শিক্ষকেরা দায়িত্ব পালন করেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পরীক্ষা বহাল রাখা হলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগই থাকে না। তাহলে নির্বাচন কমিশন-এ সিদ্ধান্ত কীভাবে নিল?
আরও মজার ব্যাপার, তৃতীয় ধাপে নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ৩০ ডিসেম্বর ঘোষণা করে। আবার ঐদিন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে থাকবে নানা ধরনের অনুষ্ঠান। ঐদিন কীভাবে তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব?
এ ধরনের লেজে-গোবরে অবস্থার মূলে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অপরিণাম দর্শিতা যা সত্যিই বিস্ময়কর ও উদ্বেগ জনক। এ ব্যাপারে নির্বাচন বিশ্লেষকরা সাথে সাথে মন্তব্য করেন। তাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনের বিশাল কর্মযজ্ঞ একা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে দারুণভাবে অসম্ভব। একার পক্ষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সবকিছু সামাল দেওয়া অসম্ভব। তাই সরকারের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করে, এ ধরনের কার্যক্রম শুরু করা উচিত ছিল। সরকারের সাথে আলোচনা করে নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ও রোডম্যাপ ঘোষণা করলে, সহজে এ ধরনের লেজে গোবরে অবস্থা হতো না। এমনকি সরকার ও ইসির মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হতো না।
এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ১৪ সেপ্টেম্বর সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা এবং ১৫ সেপ্টেম্বর করা প্রতিক্রিয়ার চিত্র উপলব্ধি করে মুহূর্তেই অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত নয়, ওদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং ১২ ডিসেম্বর থেকে প্রথম ধাপে নির্বাচন শুরু বিষয়ে কিছু জানেন না বলে মত ব্যক্ত করায় পুরো ইসি ফেঁসে যায়। এ বিষয়ে হঠাৎ তোলপাড় হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ শাক দিয়ে মাছ ঢাকার প্রক্রিয়ায় বলেন, প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্য শিরোধার্য। এ ব্যাপারে পাল্টা মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখাবো না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।
উপসংহারে বলতে পারি, আমরা অতীতেও দেখেছি সরকারের অনেক স্পর্শকাতর বিষয় মন্ত্রীরা জানেনা, সচিবরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। ব্যাপারটি খানিকটা ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি যাওয়ার মতো’। আমরা মনে করি, নানা মুনির নানা মত বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যাপারে অবশ্যই একটি কংক্রিট শিডিউল ঘোষণা করা দরকার। কারণ দেশের মানুষ দীর্ঘকাল পর স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচনের মুখ দেখতে চলেছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এএজে
