পার্থময় চট্টোপাধ্যায়
মহালয়ার ভোর। আকাশে পুজোর গন্ধ, কানে চণ্ডীপাঠের সুর। আর সেই পরিচিত আবহের মধ্যেই কলকাতা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি এক অজানা গন্তব্যের সন্ধানে। কোথাও যাওয়ার পূর্বপরিকল্পনা নেই, নেই চেনা পর্যটনকেন্দ্রের হাতছানি। আছে শুধু পথের টান আর ইতিহাসের অলিগলিতে হারিয়ে যাওয়ার দুর্নিবার ইচ্ছা।
ডানকুনি পেরোতেই কানে এল মহালয়ার শঙ্খধ্বনি। তারপর বেজে উঠল সেই চিরপরিচিত চণ্ডীপাঠ— ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির…’। মুহূর্তে মনে হলো, শরৎ যেন তার সমস্ত আবেগ নিয়ে দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে।
এ বারের পুজোয় আমাদের গন্তব্য বীরভূমের সুরুল। শান্তিনিকেতনের অদূরে লালমাটির এক ঐতিহাসিক জনপদ। সেখানে আজও সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সরকারবাড়ি, আর তার অন্দরমহলে বেঁচে আছে বনেদি দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, আচার আর লোকজ জীবনের নানা অনুষঙ্গ।
এ যাত্রা নিছক প্রতিমা দর্শনের নয়। এ যাত্রা কয়েক শতকের ইতিহাস ছুঁয়ে দেখা, পুরোনো দিনের পুজোর রীতিনীতি জানা এবং গ্রামবাংলার উৎসবকে তার নিজস্ব পরিবেশে অনুভব করার।
ছেলেবেলা থেকে শুনে আসা ভোরের এই চণ্ডীপাঠ শুনতে শুনতে এগিয়ে চললাম বর্ধমানের দিকে। ধীরে ধীরে অন্ধকার সরিয়ে ভোরের আলো ফুটছিল। রাস্তার ধারে একগুচ্ছ কাশফুল দেখে ব্রাহ্মণী গাড়ি থামাতে বলল। বাহ্! যা চাইছিলাম, তাই পেলাম। একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। চা আর কাশফুল একসঙ্গে পেয়ে বেশ ভালো লাগল।
ঠিক করলাম, হিন্দুস্থান হোটেলে ব্রেকফাস্ট করে সোজা বনলক্ষ্মীতে লাঞ্চ করে বিকেল-বিকেল বাড়ি ফিরে আসব।
ব্রেকফাস্ট হলো। এ বার চলেছি ইলামবাজার পেরিয়ে বনলক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে। কিন্তু গাড়িতে বসে দুই ঘণ্টার মধ্যে কি দুটো আলুপরোটা হজম করে আবার ভাতের পাতে বসা যায়! তাই বনলক্ষ্মীতে খাবার অর্ডার দিয়ে ছুটলাম সুরুল সরকারবাড়ির পুজোর প্রস্তুতি দেখতে।
ফোনে কথা হলো সুরুল সরকারবাড়ির এই প্রজন্মের এক তরুণ গুনী ব্যক্তির সঙ্গে, পেশায় শিক্ষক ও এক ভালো মনের মানুষ শ্রী স্মৃতিকবি সরকারের সঙ্গে। ওনার তৈরি বেশ কিছু ভিডিয়ো প্রোগ্রাম আমাকে মুগ্ধ করে । ওঁকে জানালাম, ১৮ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর আমি বোলপুর আসছি। ওই সময় উনি ব্যস্ত থাকবেন বলে হয়তো কথা বা দেখা হবে না। তাই আজ আমি এক ঘণ্টার জন্য বড়ো বাড়ি আসছি পুজোর প্রস্তুতি দেখার উদ্দেশ্যে।
উনি আমাকে সানন্দে আহ্বান করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এটাই যে, উনি একটু দূরে যাওয়ায় দেখা হলো না ওঁর সঙ্গে।
আমি যখন এই সুরুল জমিদারবাড়ির নাটমন্দিরে পৌঁছালাম, তখন ফাঁকা চত্বরে শুধু আমি আর যিনি ঠাকুর বানাচ্ছেন, সেই শিল্পীর কিছু লোকজন।
ঠাকুর বানাচ্ছেন যিনি, তাঁর নাম শ্রী সুভাষ সূত্রধর। সাবেকি ঢাকের সাজে মা সাজছেন। রথের দিন কাঠামো পুজো হয়। মায়ের কাঠামোতে গঙ্গার মাটি লেপন করে শুরু হয় এই দেবীমূর্তি বানানোর কাজ।
এখানে মায়ের মূর্তি বানানো হয় সম্পূর্ণটাই হাতে, ছাঁচে নয়। হাতে গড়া হয়। মন্দির গৃহ সহ নাটমন্দির রং করা হয়েছে , যা প্রতি বছর হয়, এই লেপন পেছন কিন্তু শুধু চুন আর তার সঙ্গে রং দিয়ে হয় , কোথাও বাজারে চালু পেইন্ট ব্যবহার হয় না। মন্দিরটি দীর্ঘদিন ধরে শ্রেফ চুন সুরকির উপর দাঁড়িয়ে আছে, মন্দিরের মেঝে যদিও বর্তমানে পাথর দিয়ে করা হয়েছে কিন্তু আগে এর মেঝে ছিল চুন সুরকির ।
জন্মাষ্টমীতেও পুজোর কিছু আচার ও প্রথা পালন করা হয়।
সপ্তমীতে চৌদোলা করে নবপত্রিকা স্নান হয় গ্রামের অদূরে নতুন পুকুরে। দেবীর চক্ষুদান হয়, তারপর পুজোর অনুষ্ঠান শুরু। মায়ের ভোগে অন্নভোগ থাকে না। লুচি ও ১৮ পদের ফল-মিষ্টি থাকে। সেই দিন চালকুমড়ো বলি হয়। সন্ধ্যায় বেলজিয়াম কাচের ঝাড়লণ্ঠনগুলো রেড়ির তেলে জ্বালানো হয়। রাত ১১টা থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। থাকে সামাজিক যাত্রাপালা। সারা রাত এই অনুষ্ঠান চলে।
অষ্টমীতে পাঁঠাবলি হয় ও রাতে ঐতিহাসিক যাত্রাপালা হয়। নবমীতে আখ ও চালকুমড়ো বলি হয় এবং রাতে থাকে আধুনিক যাত্রাপালা। কলকাতা, বীরভূম ও বর্ধমান থেকে যাত্রাদল আসে।
দশমীতে সকালে ঘটে বিসর্জন হয় এবং প্রতিমা নিরঞ্জন হয় রাতে কালিশায়ারের পুকুরে।
প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো সুরুল সরকারবাড়ির এই দুর্গাপুজো। জমিদার ভরতচন্দ্র ঘোষের ছেলে কৃষ্ণহরি সরকার এই পুজোর সূচনা করেছিলেন।
বর্ধমান জেলার ছোট নীলপুর গ্রাম থেকে বীরভূমের বোলপুরের সুরুল গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন ভরতচন্দ্র ঘোষ। ‘সরকার’ পদবি ব্রিটিশদের প্রদত্ত। বর্ধমানের রাজার কাছে দু’টি জমিদারির লাট কিনে এখানেই জমিদারিত্ব শুরু করেছিলেন।
আজও চিরাচরিত প্রথা মেনেই পুজো হয়। সুরুল জমিদারবাড়ির পুজোর মূল আকর্ষণ হলো দেখার মতো বৃহৎ সুসজ্জিত অট্টালিকাটি। বড় বড় থাম, ঐতিহ্যবাহী জানলা-দরজা, সিংহদুয়ার।
বনেদি বাড়ির পুজো মানে কেবল দেবী দুর্গার আরাধনা নয়। তার সঙ্গে মিশে থাকে কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি, পারিবারিক আভিজাত্য, গ্রামের মানুষের আবেগ এবং হারিয়ে যেতে বসা বাংলার এক জীবনযাত্রা।
শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। কাশফুলের দোলায় যখন বাংলার প্রকৃতি উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে, তখন পুরোনো বাড়ির উঠোনেও যেন ফিরে আসে অতীতের পদধ্বনি। ঠাকুরদালানের পরিবেশ, পুজোর আচার, ঢাকের শব্দ আর পরিবারের সদস্যদের মিলন— সব মিলিয়ে এই পুজো হয়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে এক আত্মিক সংলাপ।
বোলপুরের পরিচিত পথ ছেড়ে সুরুলের এই পুরোনো বাড়ির সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়, ইতিহাস সব সময় জাদুঘরের কাচের বাক্সে বন্দি থাকে না। কখনও তা বেঁচে থাকে একটি ঠাকুরদালানে, কখনও ঝাড়লণ্ঠনের আলোয়, কখনও সানাইয়ের সুরে— আর কখনও বা এক পরিবারের বহু প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া পুজোর প্রদীপে। সুরুল সরকারবাড়ির দুর্গাপুজো সেই জীবন্ত ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
এই সুরুলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেছিলেন তাঁর পল্লি উন্নয়নের স্বপ্নের প্রকল্প। এই সুরুল গ্রাম ও এর আশপাশ জুড়ে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক কাহিনি ও তাঁর উপস্থিতির স্মৃতি। শান্তিনিকেতন ও বোলপুরের যে উন্নয়ন হয়েছে, তার তুলনায় শ্রীনিকেতনের প্রতি একটু অবহেলা দেখতে পাওয়া যায়। এখানেও সাংস্কৃতিক সম্পদ রয়েছে।
এই সুরুল গ্রামে কাছেই এক গ্রাম যার নাম বাঁধাগড়া, সেখানে সানাই ও ঢোল বাজানোর শিল্পে একেকজন প্রতিভাবান মানুষ বাস করেন। তাঁদের প্রচার নেই। এই বাদকরাই আজ জগ যুগান্তর ধরে সুরুল বড়ো বাড়ি ও ছোট বাড়িতে পুজোয় ঢোল ও সানাই বাজিয়ের আসছে। সুরুল গ্রামের কোনও পুজোয় ঢাক এর বদলে ঢোল বাজানো হয় । এই নাটমন্দিরে শুধু দুগা পূজোই অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু এই সরকারবাড়ির অন্যান্য পুজো যেমন... নারায়ণ পুজো, লক্ষীপুজো পূর্ণিমায় পুজো ও যাবতীয় শুভ অনুষ্ঠান দূর্গা মন্দিরের পাশে নারায়ণ মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় আর এই সরকার বাড়ির সরস্বতী পুজোটা একটু অন্য ধরনের হয় , কিনো মূর্তি পুজো হয় না , একটা বেদিতে ঘট প্রতিষ্ঠিত হয় আর সেই বেদিতে বাড়ির পড়ুয়াদের বই খাতা একেকটা হলুদ কাপড়ে কোনআনুনি করে বেঁধে রাখা হয় আর এই হলুদ কাপড় কাঁচা হলুদের জলে হলুদ করা হয় আর চাল পুড়িয়ে তা গুঁড়ো করে জলে দিয়ে দোয়াত ভোরে কালী করা হয়। দূর্গা পুজোর মতো এই সরস্বতী পুজোটাও সে পুরোনো পদ্ধতিতে হয় ।
সরকার ও প্রশাসনের কাছে আবেদন করব, এই সুরুল, শ্রীনিকেতন, সুপুর গ্রাম ও দোরান্ডা জঙ্গলে সরকারি জমিতে যদি হোমস্টে করার অনুমতি ও লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে গ্রামীণ পর্যটনের একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং কর্মসংস্থান হবে।
আসুন, সুরুল জমিদারবাড়ির এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বনেদি পুজো দেখতে। কোভিডের আগে পর্যন্ত সরকারি পর্যটন দপ্তর থেকে এই পুজো দেখার জন্য কলকাতা থেকে পর্যটকদের নিয়ে আসা হতো, কিন্তু এখন তা বন্ধ হয়ে আছে।
