কালো মায়ের পোস্তর বড়া ছাড়া চলে না! তা সে সপ্তমীর অন্নভোগ। বা মহাষ্টমীর লুচি,পায়েশ। কিংবা নবমীতে খিঁচুড়ি। পোস্তর বড়া থাকবেই। পুরুলিয়ার আড়শার দেউলঘাটায় দশভুজার কালো কুচকুচে প্রস্তর মূর্তির পুজোয় ওই পোস্তর বড়া যেন অন্যতম প্রধান ভোগ। তবে সপ্তমীতে অন্ন ভোগে আলু পোস্তও থাকে। এই পুজোর সঙ্গে যারা জড়িয়ে আছেন তারা বলেন, পোস্ত প্ৰিয় কালো মা!
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের কথায়, এই পাথরের দুর্গা মূর্তি ভারতের অন্যতম প্রাচীন। আবার কেউ বলেন নবম শতাব্দীর শিল্পশৈলী। তবে যারা এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। অর্থাৎ পুরোহিতের পরিবার থেকে যারা এই পুজো করেন সেই জয়পুরের তুনতা গ্রামের রাজপুত পরিবারের কথায়, এখানকার পুজো প্রায় ১২০০ বছরের প্রাচীন। সেই সময় বাংলায় পাল বংশের রাজত্বকাল। তবে এই অঞ্চলে সেই সময় জৈনদের প্রভাব ছিল। তাদের সময়কার এই কালো দুর্গা। আসলে পুরুলিয়ার এই অঞ্চলে জৈনদের আধিপত্য ছিল দীর্ঘদিন। এই দেউলঘাটায় যে দেউল এখনও রয়েছে তা রেখ শিল্প শৈলীতে তৈরি। যা চোখ টানে সকলের। অতীতে এখানে দুটি পাথরের দেউল ছিল। যা আর নেই। এখন দুটো ইটের দেউলের সংস্কার করছে রাজ্য। দেউলঘাটায় কালো মায়ের পুজোকে ঘিরেই এই এলাকা পুরুলিয়ার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তবে পরিকাঠামোর অভাব থাকলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের কথায়, এই পাথরের দুর্গা মূর্তি ভারতের অন্যতম প্রাচীন। আবার কেউ বলেন নবম শতাব্দীর শিল্পশৈলী।
একদিকে কাঁসাই নদীর তিরতিরে স্রোত। সেই সঙ্গে ঘন জঙ্গল। আর তার মাঝেই কালো মায়ের মন্দির। এখানে প্রকৃতি আর ইতিহাস যেন কথা বলে। তাই বাংলার পর্যটন মানচিত্রে পরিকাঠামোর অভাব থাকা সত্ত্বেও ঢুকে গিয়েছে এই দেউলঘাটা। জয়পুরের তুনতা গ্রামের যে রাজপুত পরিবার এই পুজো করে আসছে তাদের তরফে ভুবন সিংহ বলেন, “পোস্ত-র বড়া মায়ের খুব পছন্দের। তাই মায়ের ভোগে পোস্তর বড়া থাকবেই।” লোকসংস্কৃতি গবেষক সুভাষ রায় জানান, “দেউলঘাটায় মূলত নবম-দশম শতাব্দীতে ইট ও পাথরের ওড়িশি রেখশৈলীর দেউল গড়ে উঠলেও, বর্তমানে কেবল দুটি ইটের দেউল টিকে রয়েছে।
গবেষকদের মতে স্থানটি শুরুতে জৈন কেন্দ্র হলেও পরে ব্রাহ্মণ্য ধর্মে রূপান্তরিত হয়। যা এখানকার দশভূজা দুর্গা, গণেশ ও অন্যান্য মূর্তিতে স্পষ্ট। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বহু মূল্যবান ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে এবং বর্তমানে বাকি প্রাচীন মূর্তিগুলি সংরক্ষণের অভাবে বাইরেই পড়ে রয়েছে। প্রশাসনের উচিত এই এলাকা ব্যাপকভাবে নজর দিয়ে ওই মূর্তিগুলোকে যাতে সংরক্ষণ করা যায়।” নিত্য পুজোর পুরোহিত রাজীব গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “এখানে কালো মায়ের বিশেষত্ব ডান পা মহিষের উপরে। তবে সর্বত্র দুর্গার বাম পা মহিষের উপরে থাকে। অসুরের গঠন শৈলীও দেবী দুর্গার চেয়ে অনেকটাই ছোট।” এই পুজো ঘিরে চলে ভান্ডারাও। সেই ভান্ডারায় শামিল হতে জঙ্গলঘেরা কালো মায়ের কাছে ভিড় জমান ঝাড়খণ্ডের দর্শনার্থীরাও।
