পেশায় নার্স। মুমূর্ষু রোগীকে সুস্থ করাটাই ছিল তাঁর কাজ। শনিবারও সেই কাজেই গিয়েছিলেন। বাড়িতে বলেছিলেন, ফিরতে একটু দেরি হবে। কাজ শেষে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিলেন চোরবাগানের (Chorbagan Stampede) পুজো দেখতে। কিন্তু সেখান থেকে আর ফেরা হল না তাঁর। পদপিষ্ট হয়ে মর্মান্তিক হয়ে মৃত্যু হল হুগলির বৈদ্যবাটির বাসিন্দা শ্রীপর্ণা পোদ্দারের। আর সেই খবর বাড়িতে পৌঁছতেই বাকরুদ্ধ গোটা পরিবার। মেয়ে যে নেই, এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। উৎসব যে এভাবে পরিবারে আঁধার নামিয়ে আনবে তা কল্পনাতীত।
টাটা ক্যানসার সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন শ্রীপর্ণা। শনিবার সকালে কাজ সেরে বন্ধুদের সঙ্গে চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই বাড়িতে গেল ফোন, ‘শ্রীপর্ণা আর নেই’! তাঁর এক বান্ধবী ফোন করে গোটা ঘটনার কথা জানান। সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা মেডিক্যালে ছুটে যায় পরিবার। জানা যায়, শ্রীপর্ণা তাঁর মা বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন। স্থানীয় প্রতিবেশী হরিদাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, “সকালে আমাকে বলল, একটা টোটো ডেকে দিতে। খুব প্রাণচঞ্চল মেয়ে ছিল। আমার ভাইপোর সঙ্গে পড়ত। বিএসসি নার্সিং পাশ করে চাকরি করছিল।” হরিদাসবাবুর কথায়, পাড়ায় কেউ অসুস্থ হলে সবচেয়ে আগে শ্রীপর্ণাই এগিয়ে আসত। তাঁর এই খবরে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি।
শ্রীপর্ণাদের বাড়িতেই ভাড়ায় থাকেন রিম্পা দাস। এখনও তাঁর কথাগুলো কানে ভাসছে! রিম্পা বলছেন, সকালে বলেছিল ঠাকুর দেখতে যাবে। আমি রাত ন’টা নাগাদ খবরটা পাই। সোনাই যে নেই কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই শ্রীপর্ণাদের বাড়ি যান চাঁপদানির বিধায়ক দিলীপ সিং এবং শেওড়াফুলি ফাঁড়ির পুলিশ আধিকারিকরা।
অন্যদিকে মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন কুমোরটুলি এলাকার বাসিন্দা সৌরভ মণ্ডল। লাইনেই দাঁড়িয়েছিলেন। সেই মুহূর্তেই ভয়াবহ এই ঘটনা ঘটে। একেবারে চোখের সামনে তাঁর মায়ের মৃত্যু ঘটে। ভয়াবহ ধাক্কাধাক্কিতে সৌরভ নিজেও পড়ে যান। প্রবল চাপে দমবন্ধ হয়ে আসে তাঁর। কিন্তু কোনরকমে তিনি উঠতে পারলেও ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় মা মিঠু মণ্ডলের। চোখের সামনে এভাবে মায়ের মৃত্যু দেখে শোকে বিহ্বল সৌরভ। ঠাকুর দেখতে গিয়ে এমন ঘটনার সাক্ষী তাঁকে হতে হবে তা কল্পনারও বাইরে।
প্রতিবেশী বন্ধুদের দুপুরে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, কিন্তু খাওয়ানো হল না আর! নিমন্ত্রণ জানিয়েই নিথর হলেন সোদপুর এলাকার কল্পনা জানা। রবিবার অর্থাৎ আজ দুপুরে প্রতিবেশী বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে বলে গিয়েছিলেন, ‘কাল দুপুরে একসঙ্গে খাব, আমি ঠাকুর দেখে আসি।’ কিন্তু বন্ধুদের দেওয়া কথা আর রাখা হল কল্পনাদেবীর। তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ প্রতিবেশীরা।
তাঁদের কথায়, আজ দুপুরে ওদের বাড়িতে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমাদের সঙ্গে। কল্পনাদি খুব ভালো মানুষ। পুজোয় সকলে মিলে আনন্দ করতাম, সেটা আর সইল না। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে।
