ফ্রান্সের শত শত সুপারমার্কেটকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালিয়েছে হ্যাকাররা।
এ হামলার প্রভাবে সুপারমার্কেটগুলোর ফ্রিজ ও রেফ্রিজারেটর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে হাজার হাজার টন পচনশীল খাবার নষ্ট হয়েছে।
ফ্রিজ অতিরিক্ত গরম হয়ে একাধিক দোকানে আগুনের সূত্রপাতও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
সোমবার কারফুর, মনোপ্রি, ল্য মুসকেত্যারেস-এর মালিকানাধীন অঁতেরমার্শে ও কোওপেরেতিভ ইউ’সহ ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি প্রধান প্রধান সুপারমার্কেট চেইনের রেফ্রিজারেশন সিস্টেম এই সাইবার হামলার শিকার হয়।
রাতের বেলা হঠাৎ করেই এসব ফ্রিজের তাপমাত্রা লাফিয়ে সর্বোচ্চ ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে কোওপেরেতিভ ইউ-এর প্রধান নির্বাহী দমিনিক শেলশার বলেছেন, এ সাইবার হামলার কারণে তাদের বেশ কয়েকটি দোকানের ‘পণ্য শীতল বা হিমায়িত রাখার কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লিংকডইনে দেওয়া এক বার্তায় দমিনিক শেলশার লিখেছেন, “পচনশীল খাবার সংরক্ষণ ও ফরাসি জনগণের সার্বিক খাবার সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এসব যন্ত্রপাতির ওপর হামলা চালানো গুরুতর ও অভূতপূর্ব ঘটনা, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
এ বিষয়ে সিএনবিসির মন্তব্যের অনুরাধে সাড়া দেয়নি কারফুর, মনোপ্রি, অঁতেরমার্শে, কোওপেরেতিভ ইউ ও ই লেক্ল্যার।
সাইবার নিরাপত্তা সংগঠন ‘সিকোইয়া থ্রেট ডিটেকশন অ্যান্ড রিসার্চ’-এর জ্যেষ্ঠ সাইবার থ্রেট ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক ফেলিক্স এইমে বলেছেন, এ সাইবার হামলা কেবল ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্পেন, পর্তুগাল, পোল্যান্ড, জার্মানি ও বেলজিয়ামসহ ইউরোপের আরও দেশে এ হামলার প্রভাব পড়েছে।
এদিকে, নজিরবিহীন এ সাইবার হামলার কড়া সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক কমিশনার ক্রিস্তফ হ্যানসেন।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “অঁতেরমার্শে, কোওপেরেতিভ ইউ ও ই লেক্ল্যার-এর মতো কোম্পানিতে খাদ্যপণ্যকে লক্ষ্য করে যে সাইবার হামলা চালানো হয়েছে আমি তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
“খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে এখন প্রতিটি স্তরেই সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ খাবারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা এখন আর ধারণায় সীমিত নেই, চূড়ান্ত বাস্তবে রূপ নিয়েছে।”
এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে সাইবার হামলা আরও ভয়াবহ
রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানির ওপর সাইবার হামলার কারণে তাদের প্রায় ১৮০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে খুচরা বিক্রেতা কোম্পানি ল্য মুসকেত্যারেস।
এক ইমেইলে কোম্পানিটি বলেছে, এ হামলায় তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ‘কয়েক কোটি ইউরোতে’।
দোকানগুলোর অভ্যন্তরে রেফ্রিজারেশন সিস্টেম তদারকির দায়িত্বে থাকা সার্ভিস প্রোভাইডারের ওপর এই হামলার ফলে তাদের বেশ কিছু টাটকা খাবার নষ্ট ও হিমায়িত পণ্যের ফ্রিজ পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে।
ল্য মুসকেত্যারেসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঁতেরমার্শে ও নেতো অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত সব পণ্য সরিয়ে ফেলা ও ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।
“কিছু দোকানে যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত গরম হয়ে ধোঁয়া তৈরি করেছিল। তবে বড় ধরনের কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।”
ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত হিসাব বের করতে আদালতের প্রতিনিধি ও বীমা বিশেষজ্ঞদের তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য বর্তমানে অপেক্ষা করছে ল্য মুসকেত্যারেস।
এদিকে, বিখ্যাত ডাচ সুপারমার্কেট চেইন ‘আলবার্ট হেইন’-এর মালিক ও ‘স্টপ অ্যান্ড শপ’-এর মূল কোম্পানি আহোল্ড দেলহাইজে বলেছে, তারাও তাদের নেটওয়ার্কে ‘নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতার’ মুখে পড়েছে।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের অনেক সিস্টেম অফলাইন বা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তবে দোকানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে তারা।
বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলা ও অপরাধের যে বড় ধরনের ঢেউ চলছে এটা তারই অংশ বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
তারা সতর্ক করে বলছেন, এআই ব্যবহারের ফলে সাইবার হামলাগুলোর ধরন ও সক্ষমতা এখন বহুগুণ বেড়েছে।
গেল সপ্তাহেও ব্রিটিশ অনলাইন ফ্যাশন রিটেইলার ‘আসোস’ বড় সাইবার হামলার শিকার হয়। যার মাধ্যমে কোম্পানিটির অনেক গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যাবলি হাতছাড়া হয়ে যায়।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে চালানো এক সাইবার হামলার শিকার হয়ে জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের একটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা চার দিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
ইন্টারপোলের গ্লোবাল চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার বিয়র্ন আর. ওয়াতন বলেছেন, হ্যাকাররা এখন এআই ব্যবহার করে একইসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারছে। ফলে সাইবার হামলার ব্যাপকতা ও গতি বেড়েছে।
“এটা অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো আকস্মিক বিপ্লব নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে অপরাধের একটি ধাপে ধাপে বিবর্তন।”
