যে সাহসী বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে শিরোনামে এসেছিলেন রোন্ডা রাউজি
নারী মিশ্র মার্শাল আর্টের (এমএমএ) ইতিহাসে রোন্ডা রাউজি এমন এক নাম, যিনি শুধু রিংয়ের পারফরম্যান্স দিয়ে নয়, নিজের স্পষ্টবাদী বক্তব্য দিয়েও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছিলেন। লড়াইয়ের আগে যৌনসম্পর্ক নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তবে বিতর্কের বাইরেও নারী যোদ্ধাদের জন্য UFC-তে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর ক্রীড়া সাংবাদিক জিম রোমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে লড়াইয়ের আগে যৌনসম্পর্ক এড়িয়ে চলার প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন রাউজি। জবাবে তিনি প্রচলিত ধারণার বিপরীতে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যৌনসম্পর্কের কারণে নারীদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন। এ কারণে লড়াইয়ের আগে যৌনসম্পর্কের চেষ্টা করেন বলেও জানান তিনি।
ইয়াহু স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাউজি বলেন, তিনি এ জন্য অপরিচিত কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতেন না। তাঁর স্থায়ী সঙ্গী থাকলে আসন্ন লড়াইয়ের বিষয়টি তাঁকে জানিয়ে দিতেন। ব্যক্তিগত জীবন ও ক্রীড়াপ্রস্তুতি নিয়ে তাঁর এমন অকপট বক্তব্য দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে লড়াইয়ের আগে যৌনসম্পর্কের প্রভাব নিয়ে ক্রীড়া ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভিন্ন আলোচনা রয়েছে। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া চিকিৎসক ইয়ান শ্রিয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতার আগের দিন যৌনসম্পর্ক করলে অ্যাথলেটদের শক্তি বা সহনশীলতা কমে যায়—এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ফলে রাউজির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মতামতকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
১৯৮৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইডে জন্মগ্রহণ করেন রাউজি। মার্শাল আর্টে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল জুডোর মাধ্যমে। ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে নারীদের ৭০ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ পদক জিতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজের পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জুডো থেকে মিশ্র মার্শাল আর্টে এসে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন।
রাউজির ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল UFC-তে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়া। ২০১২ সালের আগস্টে UFC প্রেসিডেন্ট ডানা হোয়াইট তাঁকে একজন তারকা হিসেবে অভিহিত করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে নারী প্রতিযোগীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার আনাহাইমে UFC 157 আসরে লিজ কারমুশের বিপক্ষে প্রধান লড়াইয়ে অংশ নেন রাউজি। এটি ছিল UFC-র ইতিহাসে প্রথম নারী লড়াইয়ের আসর। সেই লড়াইয়ে কারমুশকে পরাজিত করে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেন তিনি। এর মাধ্যমে নারী এমএমএ প্রতিযোগীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত মিশ্র মার্শাল আর্ট সংস্থাগুলোর একটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে UFC-র নারী বেন্টামওয়েট বিভাগের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হন রাউজি। টানা ছয়বার শিরোপা ধরে রেখে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তাঁর লড়াইয়ের ধরন, দ্রুত প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার সক্ষমতা এবং গণমাধ্যমে উপস্থিতি তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত মুখে পরিণত করে।
তবে ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা খান রাউজি। UFC 193 আসরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে হলি হোলমের বিপক্ষে শিরোপা রক্ষার লড়াইয়ে অংশ নেন তিনি। দ্বিতীয় রাউন্ডে হোলমের মাথায় করা কিকের পর রেফারি লড়াই থামিয়ে দেন। এর মধ্য দিয়ে রাউজির অপরাজিত থাকার ধারার অবসান ঘটে এবং তিনি চ্যাম্পিয়নের শিরোপা হারান।
রিংয়ের বাইরের বিতর্ক, স্পষ্টবাদী মন্তব্য এবং প্রতিযোগিতামূলক সাফল্য—সব মিলিয়ে রাউজির ক্যারিয়ার ছিল আলোচনাবহুল। তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান শুধু ব্যক্তিগত শিরোপা বা জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। UFC-তে নারী প্রতিযোগীদের অন্তর্ভুক্তি ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা পরবর্তী প্রজন্মের নারী যোদ্ধাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করেছে।
ক্রীড়াঙ্গনে অনেকেই পরিচিতি পান সাফল্যের কারণে, কেউবা আলোচনায় আসেন বিতর্কিত বক্তব্যের মাধ্যমে। রোন্ডা রাউজির ক্ষেত্রে এই দুই বিষয়ই পাশাপাশি চলেছে। তবে নারী এমএমএকে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে ক্রীড়ার ইতিহাসে আলাদা জায়গা দিয়েছে। তাঁর হাত ধরে যে দরজা খুলেছিল, তা পরবর্তী সময়ে নারী যোদ্ধাদের জন্য আরও বিস্তৃত হয়েছে।
