অনেকেই ঘুমের মধ্যে অজান্তেই দাঁত কিড়মিড় করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যার নাম ব্রুক্সিজম। দীর্ঘদিন ধরে এমন অভ্যাস চলতে থাকলে চোয়ালে ব্যথা, মাথাব্যথা এবং দাঁতে সংবেদনশীলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে অনেকেই দাঁত কিড়মিড় করাকে রোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। অনেকেই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সঙ্গে এ অভ্যাসের যোগসূত্র রয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রে এর কারণ এক নয়। ঘুমের সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থাও দাঁত কিড়মিড় করার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো মানুষ ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় কেনো করে?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাহি পোপাটের মতে, মানসিক চাপ বা কোনো আঘাতজনিত অভিজ্ঞতা শরীরকে ‘লড়াই করো অথবা পালাও’ অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। এসময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং পেশিগুলো টানটান হয়ে ওঠে। এর প্রভাব চোয়ালের পেশিতেও পড়তে পারে, ফলে দাঁত চেপে ধরা বা ঘষার প্রবণতা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, অনেক রোগী দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাসকে জীবনের কোনো চাপপূর্ণ সময়ের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে ওই সময় থেকে সমস্যাটি শুরু হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে আগে থেকে থাকা সমস্যা বেড়ে যায়।
তবে দাঁত কিড়মিড় করা শুধু রাতের ঘুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেউ ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষেন, আবার কেউ জেগে থাকা অবস্থাতেও অজান্তে দাঁত চেপে রাখেন।
দাঁত কিড়মিড় করার লক্ষণ কী?
ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। তবে ঘুমিয়ে থাকার কারণে বেশির ভাগ মানুষই বিষয়টি টের পান না। ফলে নিজের অজান্তেই এ অভ্যাসের শিকার হচ্ছেন কি না, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখে ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করার বিষয়টি আঁচ করা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে বলা হয় ব্রুক্সিজম।
চলুন, জেনে নেয়া যাক ব্রুক্সিজমের কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ—
১. সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথা বা মুখে ব্যথা
২. চোয়াল শক্ত হয়ে থাকা বা ব্যথা করা
৩. দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া, চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া
৪. দাঁতে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা
৫. কানে বা কানের পাশের অংশে ব্যথা
৬. ঘুমের ব্যাঘাত এবং দিনের বেলায় ক্লান্তি
অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তারা ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষছেন। তবে দাঁতের ক্ষয় বা চোয়ালের ব্যথা দেখে চিকিৎসকেরা সমস্যাটি শনাক্ত করতে পারেন।
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো দাঁত কিড়মিড় করলে কী ক্ষতি হয়?
দন্তচিকিৎসক ড. সাইমন কোভের মতে, দাঁত ঘষার কারণে দাঁতের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলতে থাকলে দাঁতের উপরিভাগ ক্ষয়ে যেতে পারে, এমনকি দাঁত ভেঙেও যেতে পারে।
তিনি জানান, অনেক রোগী নিজেরা দাঁত ঘষার বিষয়টি বুঝতে পারেন না। কিন্তু পরীক্ষা করলে দাঁতের ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে দাঁতের ক্ষয় মেরামতের চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
তবে সব ক্ষেত্রে দাঁত কিড়মিড় করার কারণে গুরুতর ক্ষতি হয় না। ঝুঁকি নির্ভর করে সমস্যার তীব্রতা ও কত দিন ধরে এটি চলছে, তার ওপর।
এর করলেই কি সমাধান?
দন্ত বিশেষজ্ঞ ডা. আদিতি দেশাইয়ের মতে, রাতে মাউথগার্ড ব্যবহার দাঁতকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু মাউথগার্ড ব্যবহার করলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হয় না।
তিনি বলেন, দাঁত কিড়মিড় করার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষ করে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমজনিত সমস্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। কিছু ক্ষেত্রে এ সমস্যার সঙ্গে দাঁত কিড়মিড় করার সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই এমন লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
দাঁত কিড়মিড় করা কী কমানো যায়?
প্রস্থোডন্টিকস বিশেষজ্ঞ ডা. রিয়াজ ইয়ারের মতে, ব্রুক্সিজমকে শুধু দাঁত বা চোয়ালের যান্ত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, মানসিক অবস্থা ও ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে। তাই চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়ন করা জরুরি।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সকালে নিয়মিত চোয়াল বা মাথাব্যথা, দাঁতের ক্ষয়, দাঁত ভেঙে যাওয়া কিংবা ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের সমস্যা বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সহায়তাও লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁত কিড়মিড় করার চিকিৎসায় শুধু উপসর্গ কমানো নয়, এর পেছনের কারণ শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার মধ্যে কোনটি দায়ী, তা বুঝতে পারলেই উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নেয়া সহজ হয়।
