ডুলুংয়ের জল ছুঁয়ে আসা হাওয়ায় তখন শরতের গন্ধ। চারদিকে গহন সবুজ। সেই অরণ্যের বুক চিরে পথ গিয়ে থেমেছে একটি প্রাচীন মন্দিরের সামনে। বাইরে থেকে দেখলে নিভৃত দেবালয়। কিন্তু দুর্গাপুজোর ক’টা দিন এলেই বদলে যায় চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দিরের চেনা ছবি। ঢাকের আওয়াজ, ধূপের গন্ধ আর মানুষের ঢল মিশে কয়েকশো বছরের পুরনো এক পুজোর পরম্পরা যেন ফের জেগে ওঠে।
ঝাড়গ্রামের জামবনি ব্লকের চিল্কিগড়ে ডুলুং নদীর ধারে অরণ্যঘেরা এই মন্দির। জনশ্রুতি, সামন্ত রাজা গোপীনাথ সিংহ মত্তগজ এই দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সারা বছর চতুর্ভুজা অশ্বারোহিণী কনকদুর্গা রূপেই দেবীর পুজো হয়। বর্তমানে অষ্টধাতুর বিগ্রহে নিত্যপুজো চলে। ওড়িশা থেকে আসা ষড়ঙ্গী পরিবারের পুরোহিতরা বংশপরম্পরায় দেবীর আরাধনা করে আসছেন। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে অবশ্য বিশেষ আচার মেনে দেবীর পুজো হয়। তন্ত্রমতে ষোড়শোপচারে আরাধনার পাশাপাশি সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত একাধিকবার ভোগ নিবেদনের রীতি রয়েছে। সেই ভোগেও রয়েছে চিল্কিগড়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। পায়েস, লুচি, মিষ্টি, লাড্ডু, ঘি-ভাত ও নানা রকম ভাজাভুজির সঙ্গে দেবীর পাতে ওঠে হাঁসের ডিম সেদ্ধ। অন্নভোগে থাকে ভাত, ডাল, মাছের নানা পদ। দশমীতে দেবীকে নিবেদন করা হয় পান্তাভাত ও মাছপোড়া।
তবে চিল্কিগড়ের পুজোর সবচেয়ে আলোচিত পর্ব ‘বিরামভোগ’। মহাষ্টমীর নিশিতে প্রাচীন রীতি মেনে কালো পাঁঠা বলির পর তার মাংস নতুন মাটির হাঁড়িতে মশলা দিয়ে রান্নার জন্য বসানো হয়। রান্নাঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে চাবি পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাজবাড়িতে। পরদিন নবমীর সকালে সেই ঘর খোলা হয়। লোকবিশ্বাস, বন্ধ রান্নাঘরের ভিতরে দেবী নিজেই তাঁর ভোগ রান্না করেন। সেই মাংসই পরে দেবীকে নিবেদন করা হয় ‘বিরামভোগ’ হিসাবে।
দেবীর প্রাচীন পুজোকে ঘিরে নরবলি দেওয়ার কথাও স্থানীয় লোককথায় প্রচলিত। তবে তার নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও পুজোর মূল রীতিতে এখনও বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। দুর্গাপুজোর ক’দিন চিল্কিগড়ে বাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়। বিশেষ করে নবমীতে মন্দির চত্বর কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেঙে তখন ডুলুংয়ের পাড়ে একসঙ্গে মিশে যায় পুজোর মন্ত্র, ঢাকের বাদ্যি আর মানুষের কোলাহল। মন্দিরের পুরোহিত গৌতম ষড়ঙ্গী বলেন, “নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুজো হয়ে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেবীর আরাধনা চলে আসছে। মহাষ্টমীর গভীর রাতে দেবী নিজের ভোগ নিজেই রাঁধেন। নবমীর দিন সেই ‘বিরামভোগ’ দেবীকে নিবেদন করা হয়।”
