নিজস্ব ছবি এই সময়
Published on
:
5 min read
সুহিত সেন
সামনের বছরেই উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা। মেরে কেটে হাতে রয়েছে ছ’মাস। ইতিমধ্যেই সেখানে ভোটের হাওয়া গরম হচ্ছে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) এবং সমাজবাদী পার্টির (এসপি) নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স (ইন্ডিয়া) ব্লক। তবে প্রাক-নির্বাচনী এই সময়পর্বে দু’পক্ষই বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বিজেপি-কে দিয়েই শুরু করা যাক। ভোট পাওয়ার বিচারে ‘গোবলয়’-এ এই দলটি উল্লেখযোগ্য ভাবে সফল হয়েছে, বৃহত্তর ভাবে প্রায় গোটা উত্তর ভারতের পশ্চাদ্ভূমিই এর মধ্যে পড়বে। এর মধ্যে আছে ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, রাজস্থান। এর পিছনে আছে ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জোট। যেগুলির সম্ভাবনা প্রায় ছিল না বললেই চলে। এটা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর পরিকল্পিত ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ (যদিও এটা আসলে ‘পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর সাফল্য) প্রকল্প বলেও পরিচিত হয়েছে। বিজেপি-র প্রেসিডেন্ট থাকাকালীনই এই কৌশল তৈরি করেছিলেন তিনি। এই তথাকথিত জাতিজোটের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের উচ্চবর্ণও যেমন রয়েছে, তেমনই আছে নিম্নবর্ণও। উচ্চবর্ণের মধ্যে ব্রাহ্মণ এবং রাজপুত বা ঠাকুর, তাদের সঙ্গে আছে অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী বা ওবিসি-রা এবং দলিত জাতিগোষ্ঠীগুলি। আসন্ন রাজ্যসভা ভোটের জন্য বিজেপি-র মনোনয়নের তালিকাটিও এমন ভাবে করা হয়েছে যাতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এই জাতিগোষ্ঠীগুলির ভারসাম্য বজায় থাকে। তার মধ্যে আছেন দু’জন ব্রাহ্মণ, একজন ঠাকুর (যার কথা পরে আরও আলেচিত হবে), তিনজন ওবিসি এবং দু’জন দলিত। কিন্তু বিজেপি-র এই তথাকথিত ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ যে ভোটের বাজারে উত্তরপ্রদেশে খুব সহজে সফল হবে না, তার নানা ইঙ্গিত অবশ্য ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। তালিকাটি থেকেই সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
প্রথমত, তিনজন ব্রাহ্মণকে মনোনয়ন দেওয়া থেকেই স্পষ্ট, বিজেপি ব্রাহ্মণদের সন্তুষ্ট করতে মরিয়া চেষ্টা করছে। কারণ ‘ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন (প্রোমোশন অফ ইকুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশন) রেগুলেশনস, ২০২৬’ বিল নিয়ে ব্রাহ্মণরা দৃশ্যতই বিজেপি-কে নিয়ে বিরক্ত ছিল। এই আইনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতিবৈষম্যের উপর নজরদারি করা ও জাতিবৈষম্য করা হলে কঠোর শাস্তি দেওয়ার নিদান দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের কথাও বলা হয়েছে। ফলত এই রেগুলেশন-এর বিরোধিতা করে তারা। এমনকি নয়া দিল্লিতে এর বিরুদ্ধে মিছিলও বের করে তারা। তাদের অসন্তোষ এবং ক্ষোভের কারণগুলি শোনার জন্য সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠকের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে শুধু এই রেগুলেশনই নয়, ব্রাহ্মণদের ক্ষোভের আরও নানা কারণ ছিল, যার অন্যতম ব্রাহ্মণদের অপর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব এবং রাজ্যে বৈষম্যমূলক ভাবে আইন প্রয়োগ। অন্য দিকে তালিকায় ব্রাহ্মণ ও দলিতদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব দেওয়া, এবং সংখ্যায় বিপুল ওবিসি জনজাতিকেও জায়গা দেওয়ার ফলে ঠাকুর সম্প্রদায়ের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে কম। এখানে একটা সমস্যাও রয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, ওরফে অজয় মোহন সিং বিষ্ট, নিজে ঠাকুর সম্প্রদায়ের মানুষ। তিনি ‘সন্ন্যাসী’ হওয়া সত্ত্বেও, গত এক দশকে আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ঠাকুর সম্প্রদায়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, এই মর্মে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। যেমন, মাটিতে কান পাতলেই এমন প্রচুর খবর শোনা যাবে, যেখানে আইন ভঙ্গ করেও ঠাকুররা কোনও শাস্তি পায়নি।
এখন যে কোনও তালিকাতেই যদি ঠাকুরদের প্রতিনিধিত্ব না থাকে বা কম থাকে, তা হলে সর্বদাই তার তাৎপর্য হবে যোগী আদিত্যনাথের ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ। তেমন হলে তা আবার অন্য একটি সংঘর্ষে ইন্ধন জোগাবে— অমিত শাহ ও যোগী আদিত্যনাথের মধ্যে সংঘর্ষ। অন্তত গত পাঁচ বছর ধরেই সংবাদমাধ্যমে অমিত শাহ ও যোগী আদিত্যনাথের বিরোধের কথা সুবিদিত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ যত শেষের দিকে যাচ্ছে, ততই উত্তরাধিকারী কে হবে, তা নিয়ে আদিত্যনাথ ও অমিত শাহের মধ্যে যে লড়াই তীব্রতর হচ্ছে, তা আর এখন গোপন কথা নয়। এক দিকে, অমিত শাহ এখন বিজেপি-র (ভারতেরও) দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। অন্য দিকে, দেশের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জনবহুল, এবং রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজ্যের চাবি এখন যোগী আদিত্যনাথের হাতে। অন্য দিকে, আসন্ন উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটে বিজেপি সামান্যতম হোঁচট খেলেও তা বর্তমান মোদী জমানার উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক বছরের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের পরে এখন দৃশ্যতই তারা কোণঠাসা ও দুর্বল হতে শুরু করেছে। এই সব সমস্যা তো আছেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওবিসি জোটের অন্যতম মুখ স্বামী প্রসাদ মৌর্যর দলত্যাগ। তিনি নিজের দল রাষ্ট্রীয় শোষিত সমাজ পার্টি নিয়ে কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকেছেন। এর ফলে ওবিসি ভোট নিয়ে এবং তথাকথিত ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ কৌশল নিয়েই বিজেপির অন্দরে চাপানউতোর তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, উত্তরপ্রদেশ ভোটের জন্য বিজেপির প্রস্তুতি এই মুহূর্তে তেমন সুবিধাজনক জায়গায় নেই।
অন্য দিকে, ইন্ডিয়া শিবিরেও অবশ্য সব কিছু ঠিক নেই। ইতিমধ্যেই ভোটের প্রচারের প্রথম পর্বেই যেখানে বিজেপি তাদের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও বিভাজনের রাজনীতি তীব্র করতে শুরু করেছে, সেখানে অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বে সমাজবাদী পার্টি তাদের ‘পিডিএ’ ভোট একত্রিত করায় মন দিয়েছে। ‘পিডিএ’ এ ক্ষেত্রে ‘পিছড়া’ বা ওবিসি, ‘দলিত’ ও ‘অল্পসংখ্যক’ বা সংখ্যালঘু (পড়ুন মুসলিম)। অখিলেশ যাদব যদি এই তিনটি সামাজিক গোষ্ঠীকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেন, তা হলে এই বিধানসভা ভোটের লড়াইয়ে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। কিন্তু দলিত ও অ-যাদব ওবিসি সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি কতটা সমর্থ হবেন, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এই নিয়ে পরে আলোচনা করব। গত মাসের শেষের দিকে অখিলেশ যাদব তার নির্বাচনী এলাকার মানুষদের সংগঠিত করতে একটি ‘পিডিএ যাত্রা’ শুরু করেন। এটা এখনও ভ্রূণ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে, রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে এর প্রভাব কত দূর কী পড়তে পারে, তা নিয়ে এখনই মূল্যায়ন করার সময় আসেনি। কিন্তু যাত্রা শুরু করার জন্য অখিলেশের রায়বরেলিকে বেছে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এই পদক্ষেপটি যে আসলে সমাজবাদী পার্টির মূল গুরুত্বপূর্ণ জোটসঙ্গী কংগ্রেস, লোকসভায় যারা রায়বরেলির প্রতিনিধিত্ব করছে, তাদের উপরেই চাপ দেওয়া ও তাদের বিব্রত করার কৌশল, এমন মনে করা হলে তাকে ভুল বলা যাবে না। উত্তরপ্রদেশে যদি বিজেপি-বিরোধীদের জিততে হয়, তা হলে কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টিকে সৌহার্দ্যপূর্ণ, তাৎক্ষণিক নির্বাচনী বোঝাপড়ায় আসতেই হবে, যাতে দুটো দলই আর দেরি না করে এক সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে নেমে পড়তে পারে। এবং তারা যে একজোট হয়ে লড়ছে, সে বিষয়ে ভোটারের মনেও যাতে কোনও সংশয় না থাকে, সেই বার্তাও দুই দলের দিক থেকে যাওয়া একান্ত অপরিহার্য।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, সাম্প্রতিক খবরগুলি থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসের এই বোঝাপড়ায় আসতে এখনও অনেক দেরি আছে। সংবাদে প্রকাশ, বিধানসভার ৪০৩টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস ২০০টিতে লড়তে চায়, আর সমাজবাদী পার্টি তাদের মাত্র ৫০টি আসনের প্রস্তাব দিয়েছে। দু’তরফের অবস্থানই অযৌক্তিক। ২০০টা আসনে লড়ার মতো সাংগঠনিক বল বা দৃশ্যমানতা, কোনওটাই কংগ্রেসের নেই। কিন্তু তা বলে তাদের জন্য মাত্র ৫০টা আসন কোনও ভাবেই যথেষ্ট নয়। তারা এর অনেক বেশি আসনে লড়ার যোগ্য। জোটসঙ্গীকে আরও সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে সমাজবাদী পার্টিকে। এ বার এই তাসগুলির মধ্যে এমন একটা ‘জোকার কার্ড’ও আছে, যার নিখঁুত মূল্যায়ন করার অবস্থানে কেউই নেই। সেটি হলো দলিত ভোট। সব দিক দেখেশুনে মনে হচ্ছে, বহুজন সমাজবাদী পার্টির (বিএসপি) নেত্রী মায়াবতী রাজনৈতিক শীতঘুমে চলে গিয়েছেন। ফলে উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে বিএসপি-র অনুপস্থিতিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে নাগিনার সাংসদ চন্দ্রশেখর আজ়াদ, যিনি আবার ‘আজ়াদ সমাজ পার্টি (কাঁশীরাম)’-এর প্রতিষ্ঠাতাও, তিনি এই শূন্যস্থানটিতে পা ফেলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় খেলোয়াড় হিসেবে উত্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ভিত্তি তাঁর নেই। এর অর্থ হলো, দলিত ভোট, যেটা ভোটারদের ২১ শতাংশ, সেটাই এখন ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠেছে। ফলে বিজেপি ও সমাজবাদী পার্টি— প্রধান দু’দলই মরিয়া চেষ্টা করছে দলিত ভোটকে সংগঠিত করার। কিন্তু েসই ভোট যে কোন দিকে যাবে, তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
অন্য যে বিষয়টি মূল্যায়ন করা কঠিন, সেটি হলো ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন জেন জ়ি আন্দোলন উত্তরপ্রদেশ ভোটে কী প্রভাব রাখতে চলেছে। তবে নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, এই আন্দোলনের বড় প্রভাব থাকবেই। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, বিজেপি-র সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে এই আন্দোলনের কারণেই। কারণ, কেন্দ্রে ও এই রাজ্যে তারাই সরকারে রয়েছে। তবে আগামী কয়েক মাসে যা-ই ঘটুক না কেন, উত্তরপ্রদেশ ভোটের লড়াই যে হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত।
লেখক সাংবাদিক
