শীতের আগমনী বার্তায় লালমনিরহাটের কাঁচাবাজারে উঠতে শুরু করেছে আগাম জাতের কিছু সবজি। এতে সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিললেও চাল, ডাল, তেল, মাছ ও মাংসের দাম বাড়তি রয়েছে। গতকাল শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে জেলার কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
বাজারের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন জাতের সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্থিরতা চলছে। গত মাসের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম আরও বেড়েছে। চিকন চালের কেজি ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে এখন হয়েছে ৬৪ টাকা, চিকন মসুর ডাল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪২ টাকা এবং সয়াবিন তেলের লিটার ১৯৯ টাকা থেকে বেড়ে ২০৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, ডিমের দাম ডজনে ৬ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। গত তিন মাসে চাল, তেল, ডিম ও মসুর ডালের দাম ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মাছ ও মাংসের দামেও ওঠানামা রয়েছে। ছোট মাছের দাম স্থিতিশীল থাকলেও নাইলোটিকা, রুই, গ্রাসকার্প ও পাঙাশের মতো বড় মাছের দাম কেজিতে ১৫-৩০ টাকা বেড়েছে। মুরগির মধ্যে বয়লারের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি ও দেশি মুরগির দাম কেজিতে ১৫-২০ টাকা বেড়েছে। গরুর মাংস আগের মতোই কেজিপ্রতি ৭০০-৭৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় ক্রেতা ও বিক্রেতারা জানান, গত তিন মাসে মাছ ও মাংসের দাম কেজিতে ১৫-৩০ টাকা বেড়েছে।
সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। আলু ও বেগুন বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০ টাকায়, পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় ও করলা ৬০-৭০ টাকায়। আকারভেদে প্রতি পিস লাউ ১৫-২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে আসা শীতের নতুন সবজির মধ্যে কপি কেজিপ্রতি ৮০ টাকা। নতুন সিমের দাম চড়া, বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায়।
কাঁচাবাজারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন খেটে খাওয়া নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষ। তাদের আয় সীমিত ও নির্দিষ্ট। চাল, ডাল, তেল, মাছ, ডিম ও শাকসবজির দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি। ফলে সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে খাবারের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য কমাতে হচ্ছে। কেউ মাছ-মাংস কেনা ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ আবার ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। বাজারের বাড়তি দামের চাপ শুধু পকেটেই নয়, পরিবারের পুষ্টি চাহিদা, সন্তানদের পড়াশোনা ও সার্বিক জীবনযাত্রার মানেও প্রভাব ফেলছে।
আদিতমারী কাঁচাবাজারের ক্রেতা অটোচালক চান মিয়া বলেন, আমরা সারা দিন অটো চালিয়ে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করি। সেখান থেকে প্রতিদিনের বাজার করতে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। সবজি ও চাল কিনেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে, মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্য হচ্ছে না।
একই বাজারের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন ধরে বাজারদর কমা-বাড়ার মধ্যে রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমাদের পরিবহন খরচ বেড়েছে। অনেক সময় উৎপাদন কম হলে আমদানিও কম হয়, তখন আমাদের বেশি দামে কিনতে হয়, বেশি দামেই বিক্রি করতে হয়। এখন কিছু নতুন সবজি বাজারে এসেছে, যেগুলোর চাহিদা বেশি। সেগুলোও বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। আমরা কেজিতে ৫-১০ টাকা লাভে বিক্রি করি।
একই বাজারের ক্রেতা মাধব চন্দ্র বলেন, কিছু সবজির দাম নাগালের মধ্যে থাকলেও অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়েছে। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ হয়েও অনেক ভেবেচিন্তে বাজার করতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমরা হতাশ।
আদিতমারীর বুড়ির বাজারের ক্রেতা ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা নিজেরা যে সবজি উৎপাদন করি, সেগুলোর দাম কম। আবার বাজারে কিনতে গেলে দাম বেশি। আমরা চাই, পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কোনো সিন্ডিকেট যেন না থাকে। সরকার যেন বাজার মনিটরিং করে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
কালীগঞ্জের শিয়াল খাওয়া বাজারের মুরগি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, ফিডের দাম বস্তাপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুতের বিল বেশি, সব ধরনের ওষুধের দামও বেড়েছে। তাই মানুষ আর খামারে মুরগি তুলতে চায় না। মুরগির উৎপাদন কমে যাওয়ায় দূর-দূরান্তের খামার থেকে মুরগি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, ফলে আমাদের বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।
লালমনিরহাট ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ লিটন বলেন, লালমনিরহাটের বাজারগুলোতে দ্রব্যমূল্য অত্যধিক বেড়ে গেছে। বাজারদর বৃদ্ধির মূল কারণ আমদানির ঘাটতি ও তদারকির অভাব। সরকারের উচিত পণ্যের ওপর ট্যাক্স-ভ্যাট কমানো এবং বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা শাখাগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত টিম নিয়মিত তদারকি করলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মুরাদ মোর্শেদ/আরএআর
