শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে ফাঁকা হয়ে গেছে চিরচেনা যানজটের নগরী ঢাকা। প্রতিদিনের মতো রাস্তায় নেই সারি সারি গণপরিবহন।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে ফাঁকা হয়ে গেছে চিরচেনা যানজটের নগরী ঢাকা। প্রতিদিনের মতো রাস্তায় নেই সারি সারি গণপরিবহন। নেই কর্মজীবী মানুষের চিরচেনা ব্যস্ততাও। আর এতেই চিরচেনা রূপ হারিয়ে রাজধানী এখন অনেকটাই শান্ত ও ভিন্ন আমেজে রূপ নিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।
দেখা গেছে, ঢাকার অধিকাংশ সড়কই ফাঁকা। বাসস্ট্যান্ডগুলোতে নেই যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন। ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মিরপুর রোড ও সংসদ ভবন রোডের মতো ব্যস্ত সড়কেও নির্বিঘেœ চলাচল করছে সব ধরনের যানবাহন। এসব সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত, সেখানে এখন গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগছে অর্ধেকেরও কম। সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, বিমা ও কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন নগরবাসী। ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে বের হয়েছেন ধানমন্ডির বাসিন্দা আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ছুটির কারণে ঢাকা ফাঁকা হয়ে গেছে। ফাঁকা ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে একটু ঘোরাঘুরি করার জন্য বের হয়েছি। দুপুরে একটি ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া সেরে কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্র ঘুরে বাসায় ফিরব। কারণ, স্বাভাবিক সময়ে এমন ফাঁকা ঢাকা পাওয়া যায় না।’
মিরপুর রোডে দেখা মিলল ৬০ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তারের। তিনি তার ছয় বছরের নাতিকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছেন। তিনি জানান, তার ছেলে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। এ কারণে আজ তাকে অফিসে যেতে হয়েছে। ছুটি থাকায় নাতিকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছেন তিনি। আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘ঢাকার এমন চিত্র দীর্ঘ ছুটি ছাড়া দেখা যায় না। যারা ঢাকার বাইরে থেকে জীবিকার তাগিদে এখানে আসেন, তারা দীর্ঘ ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে শহর ছেড়ে গ্রামের উদ্দেশে চলে যান। এতেই ফাকা হয়ে পড়ে এই শহর। নগরীর এই চিত্র অচেনা হলেও আমরা যারা ঢাকায় আছি, তাদের জন্য কয়েক দিনের এই পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক।’
মালেক নামের এক পথচারী জানান, স্বাভাবিক সময়ে ধানমন্ডি-২৭ থেকে মিরপুর-১০ যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। বাসে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি থাকে, আসন পাওয়াও কষ্টকর হয়। তবে আজকের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বাসে উঠে বসতে পারলে ২০ মিনিটের মধ্যে মিরপুর-১০ পৌঁছে যাওয়া যাব। আবার আসন পেতেও কষ্ট হবে না। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতেও বেগ পেতে হচ্ছে না। অন্য দিনগুলোতে প্রতিযোগিতা করে ফুটপাতে হাঁটতে হতো। কয়েকজন বাসচালকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ছুটির কারণে যাত্রীদের তেমন ভিড় নেই। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে যাত্রীরা বাসে ঠেলাঠেলি করে উঠতেন, আজ তেমন পরিস্থিতি নেই। আসনের জন্য কাউকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। বরং অনেক আসন ফাঁকাই থাকছে। আজিমপুর থেকে গাজীপুরগামী ভিআইপি-২৭ বাসের চালক মফিজ জানান, আজ যাত্রী নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ আসন ফাঁকা নিয়েই গাজীপুরের দিকে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ ছুটি হলেই ঢাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। নগরবাসীর অনেকে বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে কয়েক দিন ঢাকায় নির্বিঘেœ চলাচল করা যাবে। ছুটি শেষ হলে আবারও চিরচেনা রূপে ফিরবে এই শহর। তবু সাময়িক এই স্বস্তি উপভোগ করছেন নগরবাসী।
ঢাকায় শিশুকে ডাক্তার দেখাতে আসা ঝালকাঠির বজলু গাজী বলেন, ‘আমি সপ্তাহ খানে আগে মেয়ের চিকিৎসার জন্য স্বপরিবারে ঢাকায় এসেছিলাম। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার জন্য সোমবার বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখি টিকেট নেই। যে পরিবহনে যেতে চাচ্ছিলাম তার টিকেট না পেয়ে অন্য বাসের টিকেট কিনতে হয়েছে বেশি টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ঝালকাঠিগামী বাসের টিকেটের দাম দুই শত টাকা কেরি বেশি নিয়েছে কাউন্টার থেকে। ফলে বাড়তি টাকা দিয়ে টিকেট কিনতে হয়েছে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সায়েফউদ্দীন আহমেদ বলেন, ঢাকা তো ফাঁকা হয়ে গেছে। সাধারণত কুড়িল থেকে বের হতে যা সময় লাগে, আজ তার চেয়ে অনেক কম সময়েই বের হয়েছি। কিন্তু রেল স্টেশনে পৌঁছে দেখি প্রচ- ভিড়। ছুটি কাটাতে বাড়ি যাওয়ার জন্য সোমবার সন্ধ্যায় কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়েও ভিড়ের কারণে ফিরে আসেন বেসরকারি চাকরিজীবী মাশরাফি শোভন। তিনি যাবেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া। শোভন বলেন, “গতকাল (সোমবার) সন্ধ্যায় ভেবেছিলাম বাড়ি যাব। কমলাপুর স্টেশনে ভয়াবহ ভিড় দেখে আবার ফিরে এসেছি। আজ (মঙ্গলবার) যেভাবেই হোক যেতেই হবে।” বাস টার্মিনালের ভিড় এড়াতে বিকল্প জায়গা থেকে গাড়িতে ওঠার কথা জানালেন ঝালকাঠির যাত্রী তন্ময় চন্দ্র। বেসরকারি এ চাকরিজীবী বলেন, সায়েদাবাদ টার্মিনালে প্রচ- ভিড়। ওখান থেকে তাই বাসে ওঠা সম্ভব হয়নি। লম্বা ছুটির কারণে হিন্দু-মুসলমান সবাই ঢাকা ছাড়ছে। পরে দোলাইরপাড় থেকে কোনোরকমে বাস ধরলাম। মানুষ ঢাকা ছাড়ায় সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ অনেকটাই কমে আসার কথা বলছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, পূজার ছুটি ও স্কুল বন্ধ থাকার কারণে রাজধানীর সড়কে গাড়ির চাপ কমে গেছে। এখন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও খুবই স্মুদ হয়েছে। সড়কে গাড়ির চাপ কম থাকলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করাটাও সহজ হয়। রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, আমরা নানামুখী ব্যবস্থা নিয়েছি। নির্দিষ্ট স্কুলবাস চালু, প্রাইভেট কার কমানো, টার্মিনালগুলো স্থানান্তর করে রাজধানীর বাইরে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
