ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় শারমিন গ্রুপের সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার মো. জামাল উদ্দিন খান শিহাবের (৩৯) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইসমাইল হোসেন ও পরিচালক শারাফ হোসেনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দিবাগত রাতে নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়।
এর আগে, মামলা করতে গিয়ে থানায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অভিযোগ গ্রহণ না করার অভিযোগ তুলে আশুলিয়া থানার ফটকের সামনে অনশনে বসেন নিহতের বড় দুই ভাই কুতুবউদ্দিন খান ও ইস্কান্দার আলী খান। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ তাদের থানায় ডেকে নিয়ে অভিযোগ গ্রহণ করে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
নিহত জামাল উদ্দিন গাজীপুর সদর উপজেলার বুরুলিয়া-ডুয়েট এলাকার মৃত মো. সেকান্দার আলীর ছেলে। তিনি আশুলিয়ার নরসিংহপুরে অবস্থিত শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এ সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে কারখানাটির আটতলা ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের নানা প্রশ্ন?
নিহতের পরিবারের দাবি, কারখানার অভ্যন্তরীণ বিরোধ কিংবা অন্য কোনো আক্রোশের জেরে জামালকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা চলছে। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহতের খালাতো ভাই ফখরুল হাসান সোহাগ জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাকে ফোন করে জামালের ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।
জামালের ছোট সন্তান রয়েছে এবং তিনি প্রতিষ্ঠিত কর্মকর্তা ছিলেন উল্লেখ করে সোহাগ বলেন, তার আত্মহত্যার বিষয়টি পরিবারের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। এ ঘটনায় কারখানার ভেতরের কেউ কেউ প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নিহতের স্ত্রী নাহার আকৃতার বৃষ্টি জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মুঠোফোনে জামাল তাকে কারখানায় কিছুটা ঝামেলা হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। বুধবার সকালেও তাদের কথা হয়। এ সময় জামাল মালিকের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
বৃষ্টি আরও জানান, তিনি জামালকে অফিসে যেতে নিষেধ করেছিলেন। তবে অফিসে না গেলে তাকে ফাঁসানো হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন জামাল। পরে অফিসে যাওয়ার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। প্রায় দুই ঘণ্টা পর এক ব্যক্তি ফোন ধরে জামাল অসুস্থ বলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা জানান। পরে তারা তার মৃত্যুর খবর পান।
অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসির অভিযোগ, থানার ফটকে অনশন
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে নিহতের বড় ভাই ইস্কান্দার আলী বুধবার দুপুর থেকে লিখিত অভিযোগ নিয়ে আশুলিয়া থানায় যোগাযোগ করছিলেন। তবে অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি এবং বারবার অভিযোগের খসড়া পরিবর্তন করতে বলায় তারা ক্ষুব্ধ হন।
পরিবারের অভিযোগ, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলা নিতে টালবাহানা করছিল। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে নিহতের দুই ভাই থানার ফটকের সামনে অনশনে বসেন। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে ভাইয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান ইস্কান্দার আলী।
পরে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে পুলিশ দুই ভাইকে থানায় ডেকে নিয়ে অভিযোগ গ্রহণ করে। আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আবুল কালাম আজাদ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দুজনকে আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সিসিটিভি ফুটেজে লাফ দেওয়ার দৃশ্য, জানাল পুলিশ
ঘটনাস্থলে প্রাথমিক সুরতহাল করেন আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফাহিম। তিনি জানান, ভবন থেকে পড়ে নিহতের হাত-পা ভেঙে গিয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজে জামালকে লাফ দিতে দেখা গেছে বলেও উল্লেখ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে।
নিহতের পরিবারের আরও অভিযোগ, তাদের সদস্যদের মরদেহ দেখার সুযোগ না দিয়েই পুলিশ তা ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেয়।
আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নরসিংহপুরে শারমিন গ্রুপের প্রধান ফটকে গেলে নিরাপত্তা ইনচার্জ নজরুল ও নিরাপত্তাকর্মী আল আমিন সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। পরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের এমডি ও পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন নিহতের স্বজনেরা।
