শরতের নীল আকাশ, বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, দিগন্তজোড়া বালুকাবেলা আর সৈকতজুড়ে লাল কাকড়ার ছোটাছুটি। সঙ্গে সবুজ বনভূমির নীরবতা ও সাগরের ঢেউয়ের ছন্দ। প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে পূজার ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চর হেয়ার দ্বীপে।
বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এ দ্বীপে রয়েছে কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সাগর, বন ও নির্জন প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগের সুযোগ। প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সৈকত, সবুজ বনায়ন ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ চর হেয়ার প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য।
নগরজীবনের ব্যস্ততা ও যানবাহনের শব্দ থেকে দূরে এখানে শোনা যায় সাগরের গর্জন। নির্মল বাতাস, বিস্তীর্ণ সৈকত আর দিগন্তের হাতছানি ভ্রমণকারীদের এনে দিতে পারে ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা। পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য দ্বীপটি হতে পারে ভ্রমণতালিকার নতুন সংযোজন।
চর হেয়ারের অন্যতম আকর্ষণ এর বিস্তীর্ণ বালুকাময় সৈকত। সাগরের ঢেউ যখন একের পর এক তীরে আছড়ে পড়ে, তখন সৈকতের বালুর ওপর দেখা মেলে লাল কাকড়ার ছোটাছুটি। কখনো দল বেধে ছুটে বেড়ায়, আবার মানুষের উপস্থিতি টের পেলে মুহূর্তেই গর্তে ঢুকে পড়ে। প্রকৃতির এই দৃশ্য পর্যটকদের আনন্দ বাড়িয়ে দেয়।
সৈকতে দাড়িয়ে উপভোগ করা যায় বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। ভোরের আলোয় সূর্যোদয় এবং বিকেলের রঙিন আকাশে সূর্যাস্ত দ্বীপটির সৌন্দর্যে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। প্রকৃতির ছবি তোলা কিংবা সমুদ্রের পাড়ে বসে সময় কাটানোর জন্যও জায়গাটি আকর্ষণীয়।
শুধু সৈকত নয়, দ্বীপের ভেতরেও রয়েছে সবুজ বনভূমি। ঝাউ, কেওড়া, গেওয়া, বাইন ও গোলপাতাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালায় ঘেরা বনাঞ্চলে দেখা মেলে নানা ধরনের পাখির। শীত মৌসুমে অতিথি পাখির আনাগোনা বাড়লে দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
চর হেয়ারে দিনের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি তাবু ও কটেজে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে বলে স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ আর খোলা আকাশের নিচে নির্জন পরিবেশে রাতযাপন পর্যটকদের জন্য হতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা।
পর্যটকদের বসার জন্য সৈকতে ছাতার ব্যবস্থা রয়েছে। বনভূমির ভেতরে দোলনায় বসে সময় কাটানোর সুযোগও আছে। সাগরের পাড়ে ছবি তোলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ, সব মিলিয়ে এক দিনের ভ্রমণ কিংবা পরিকল্পিত রাতযাপনের জন্য আকর্ষণীয় স্থান চর হেয়ার।
তবে রাতযাপনের পরিকল্পনা করলে আগে থেকেই তাবু বা কটেজের প্রাপ্যতা, ভাড়া এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়ন থেকে দক্ষিণে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চর হেয়ার। বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন এ দ্বীপের পূর্ব দিকে রয়েছে সোনার চর, পশ্চিমে চর তুফানিয়া, উত্তরে টাইগার দ্বীপ এবং আশপাশে রয়েছে চর কাশেমসহ বেশ কয়েকটি উপকূলীয় চর।
রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে দ্বীপটির দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। চরমোন্তাজ থেকেও নৌযানে সেখানে যাওয়া যায়। তবে নৌযানের ধরন, আবহাওয়া ও যাত্রাপথের ওপর নির্ভর করে যাতায়াতের সময়ের তারতম্য হতে পারে।
চর হেয়ার ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য সাগরের তাজা মাছ, মুরগি, ভাতসহ বিভিন্ন খাবারের প্যাকেজের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তারা। আগাম যোগাযোগের মাধ্যমে নৌযান, থাকা-খাওয়া, তাঁবু ও কটেজের ব্যবস্থাও করা যায়।
স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘সোনার চর ট্যুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেলস’ পর্যটকদের এসব সেবা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আইয়ুব খান। তিনি চর হেয়ার ট্যুরিস্ট নিরাপত্তা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ভ্রমণের আগে তাবু ও কটেজের ভাড়া, খাবারের প্যাকেজ এবং নৌযানের ভাড়া সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো। দ্বীপে দোকানপাট ও চিকিৎসাসুবিধা সীমিত থাকতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ, পর্যাপ্ত পানীয় জল এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী সঙ্গে রাখা উচিত।
ঢাকা থেকে নৌপথে: ঢাকার সদরঘাট থেকে চরমোন্তাজগামী লঞ্চে যাওয়ার ব্যবস্থা সম্পর্কে খোজ নিতে পারেন। চরমোন্তাজ পৌঁছে স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তা বা নৌযানচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্রলার কিংবা স্পিডবোটে চর হেয়ারে যাওয়া সম্ভব। লঞ্চের সময়সূচি ও চলাচলের ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করা জরুরি।
সড়ক ও নৌপথে: ঢাকা থেকে বাসে পটুয়াখালী এসে গলাচিপা ও পানপট্টি হয়ে চরমোন্তাজের দিকে যাওয়া যায়। পানপট্টি থেকে নৌপথে চরমোন্তাজ পৌছে সেখান থেকে ট্রলার বা স্পিডবোটে চর হেয়ারে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়।
কুয়াকাটা থেকে: কুয়াকাটা থেকেও সাগরপথে চর হেয়ারে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে আবহাওয়া, সাগরের পরিস্থিতি ও নৌযানের প্রাপ্যতার ওপর যাত্রা নির্ভর করবে। তাই ভ্রমণের আগে স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তা বা নৌযানচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাত্রার সময়, ভাড়া ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
রাঙ্গাবালীর চর হেয়ারকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড হেলথ কেয়ার সেন্টার (সিডিএইচসি)।
তাদের উদ্যোগে পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। পাশাপাশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, তাবু ও কটেজসহ বিভিন্ন পর্যটনসুবিধা এবং সৌন্দর্যবর্ধক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।
এসব উদ্যোগের ফলে দ্বীপটিতে পর্যটকদের অবস্থান ও সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। নৌযানচালক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অন্যান্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এ খাতে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
পরিকল্পিতভাবে এসব উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা গেলে চর হেয়ারকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ দ্বীপটি দেশের পর্যটন মানচিত্রে পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ চর হেয়ারকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলা গেলে রাঙ্গাবালীর পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। এতে স্থানীয় নৌযানচালক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন নিরাপদ নৌযোগাযোগ, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা। সৈকত ও বনাঞ্চলে বর্জ্য না ফেলা এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশের ক্ষতি না করাও পর্যটকদের দায়িত্ব।
পূজার ছুটিতে চেনা পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চর হেয়ার হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। সাগরের ঢেউ, বালুকাময় সৈকত, সবুজ বন আর লাল কাকড়ার রাজ্যে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ নিয়ে দক্ষিণের এই দ্বীপ অপেক্ষা করছে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য।
