পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় গত জুন থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত অন্তত ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন জম্মু কাশ্মীর হিউম্যান রাইটস অবজারভেটরি (জেকেএইচআরও)। নিহতদের অনেকের পরিবার এখনো তাঁদের স্বজনদের মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে বেআইনি আটক, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত সংগঠনটি ৪৭ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে ৫ জুন থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নিহত ৯০ জনের নাম ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছে। অঞ্চলটিতে প্রথমে বিদ্যুতের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা অঞ্চলটির সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২৬ বছর বয়সী ফাহাদ বারকাতের মৃত্যুর ঘটনা। তাঁর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ জুন রাতে রাওয়ালাকোটের একটি সামরিক হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন তিনি। রাত ১১টা ৩১ মিনিটে বোনকে শেষ বার্তা পাঠানোর পর আর বাড়ি ফেরেননি।
ফাহাদের বোনের দাবি, হাসপাতালের ফটকে প্রবেশের সময় রাত ১টার কিছু আগে তাঁর গলায় গুলি লাগে। তবে কে তাঁকে হত্যা করেছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি মানবাধিকার সংগঠনটি। তারা এ ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফাহাদের পরিবার দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বাস করেছিল, তিনি পুলিশের হেফাজতে আছেন। তাঁর মুক্তির অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। পরে সংবাদমাধ্যম ডন নিহত বেসামরিক ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম প্রকাশ করে।
জেকেএইচআরওর আরেক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ফাহাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আগে তাঁকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করে একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। সংগঠনটি এ ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের পাশাপাশি হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তদাতাদের নথি, ময়নাতদন্ত ও দাফনের রেকর্ড প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
আন্দোলন ও নির্বাচন বয়কট
আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) স্থানীয় নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানিয়েছিল। ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত কয়েক ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জেএএসি বলেছিল, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারছে না।
৪৫ আসনের আঞ্চলিক আইনসভায় ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানের অন্য এলাকায় বসবাসরত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি জানায় সংগঠনটি। পাকিস্তান সরকার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, আসনগুলো সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত এবং কাশ্মীরের বিতর্কিত মর্যাদা নিয়ে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এরপর কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসি নিষিদ্ধ করা হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকে। আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা অভিযানও শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ জুন পর্যন্ত বিক্ষোভে বেসামরিক মানুষ ও পুলিশসহ অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আটক হয়েছিলেন। জেএএসি পরে ৫ জুন থেকে ১০০ জনের বেশি মৃত্যুর দাবি করেছে। তবে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সশস্ত্র ব্যক্তিরাও সহিংসতায় জড়িত ছিলেন। জেএএসি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ দাবির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে।
তথ্যপ্রবাহেও বাধা
অঞ্চলটিতে তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধের পাশাপাশি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেয়। ৫ জুন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। ৩১ আগস্ট থেকে ধাপে ধাপে ইন্টারনেট চালু হলেও রাওয়ালাকোট ও সুদনোতি এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল বলে জানিয়েছে ডন।
নিখোঁজ ও আটকের অভিযোগ
প্রতিবেদনে শওকত নওয়াজ মীরের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ৩০ জুন ধিরকোট থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তারের কারণ, আইনি ভিত্তি কিংবা তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানানো হয়নি। তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পরিবার তাঁর অবস্থান জানতে পারেনি।
জুলাইয়ে তাঁর বোন ইয়ামিন মীর আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টে আবেদন করে শওকতকে আদালতে হাজির করার দাবি জানান। পরিবারের অভিযোগ, তারা বারবার পুলিশ ও সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেও তাঁর অবস্থান জানতে পারেননি কিংবা তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাননি। তাঁকে উপযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়নি বলেও আবেদনে দাবি করা হয়।
আরেক ঘটনায়, ৫ সেপ্টেম্বর চিত্রা টোপি গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে এক হামলাকারী নিহত হয়েছেন বলে জানায় পুলিশ। পরে নিহত ব্যক্তির পরিচয় জাবির মুমতাজ হিসেবে জানা যায়। তাঁর পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। মরদেহ নিতে হলে তাঁকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করে একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। তারা রাজি না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ নিজেরাই দাফন সম্পন্ন করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২৯ বছর বয়সী নাকাশ জারদাদ রাওয়ালাকোটে নিজের মহিষের খামারে থাকা অবস্থায় সংঘর্ষের সময় ছোড়া গুলিতে নিহত হন বলে জানিয়েছে জেকেএইচআরও। তাঁর পরিবার জানতে চেয়েছে, বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া একজন মানুষ নিজের জমিতে থেকেও কীভাবে প্রাণঘাতী গুলির শিকার হলেন।
জেকেএইচআরওর পরিচালক আজর আহমেদ বলেন, কোনো পরিবারকে যেন তাদের স্বজনের মরদেহ কোথায় রয়েছে, তা খুঁজে বেড়াতে না হয় কিংবা আটক, দাফন ও মৃত্যুর বিষয়ে গুজবের ওপর নির্ভর করতে না হয়। তাঁর মতে, হেফাজত, চিকিৎসা, মর্গ ও দাফনের নথি প্রকাশ করলে অনেক ঘটনার জট খুলতে পারে। কর্তৃপক্ষের নীরবতা মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায় এবং জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে।
সংগঠনটি বলেছে, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একই ব্যক্তি, পরিস্থিতি বা আইনি কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। বরং প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্ত প্রয়োজন। জুন থেকে সংঘটিত সম্ভাব্য বেআইনি মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার সব ঘটনার দ্রুত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সরকার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট।
