চট্টগ্রাম বিএসটিআইয়ের বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকাল ১১টায় ‘উন্নত বিশ্বের জন্য অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি : সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’– এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ও পরিচালক (স্থানীয় সরকার) মনোয়ারা বেগম।
তিনি বলেন, বিএসটিআই কোনো অবস্থাতেই মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে ছাড় বা আপস করবে না। শতভাগ গুণগত মান নিশ্চিত করেই কেবল লাইসেন্স প্রদান করতে হবে। চট্টগ্রামে আধুনিক ল্যাবরেটরিসহ নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া দ্রুততম সময়ে সেবা লাভ করতে পারেন। এছাড়া পণ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ পরিবর্তনসহ নানাবিধ প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামগ্রিক জনকল্যাণ ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ না করলে মান নিশ্চিত করা অসম্ভব। বিএসটিআই–এর সেবা ও কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে তিনি বড় বড় শপিং মলগুলোতে প্রচারণামূলক ব্যানার টাঙানোর পরামর্শ দেন।
সভার বিশেষ অতিথি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, বিএসটিআই–এর লোগো আমাদের আস্থার প্রতীক, তাই দেশীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং ও মান নিশ্চিতকরণে ব্যবসায়ীদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি অপচয় রোধে এনার্জি অডিট চালু, ডিজিটাল সেবা কিউআর কোডের মাধ্যমে তথ্য প্রাপ্তি সহজীকরণ এবং ল্যাব স্যাম্পলের পাশাপাশি বাজারের পণ্যের মান নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসায়িক অসদুপায় রোধে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার তাগিদ দেন তিনি।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক, আইইটি ও অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ মূল প্রবন্ধে এসডিজি এর ৭ নং অভীষ্ট তথা সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিতকরণের জন্য বিভিন্ন প্রকার শক্তির সংমিশ্রণ ও নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে যথাযথ মান বজায় না থাকলে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার অগ্রগতি হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য অর্জনে উন্নত মাননিয়ন্ত্রণ ও ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। এর পাশাপাশি তিনি বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং নিয়মিত এনার্জি অডিট জোরদারের তাগিদ দেন। বক্তব্যে তিনি বিএসটিআইয়ের সোলার মডিউল ও ইনভার্টার টেস্টিং ল্যাবের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে মানভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, মান থেকেই টেকসই উন্নয়নের শুরু।
আলোচনা সভার সভাপতি চট্টগ্রাম বিএসটিআইয়ের উপ–পরিচালক (মেট্রোলজি) মো. মোমেন উস সাজ্জাদ বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য ও পণ্যের গুণগত মান রক্ষা ও তদারকির ক্ষেত্রে বিএসটিআই, চট্টগ্রাম এর অবদানসমূহ বিভিন্ন পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরেন এবং আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের ভিটামিন–এ সহ অন্যান্য জরুরি পণ্যের মান পরীক্ষণ নিশ্চিতের ব্যাপারে জানান। তিনি উল্লেখ করেন, পণ্যের মান বজায় রাখা শুধু ব্যবসায়িক সুবিধাই বাড়ায় না, বরং পরিবেশ সুরক্ষায় ও টেকসই অর্থনীতি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভোক্তাসাধারণের সুবিধার্থে ও সেবাপ্রাপ্তি সহজ করতে ডিজিটাল সেবা, কিউআর কোড এবং হেল্পলাইন (১৬১১৯) চালু করা হয়েছে। তিনি বাজারের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
ক্যাব চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভেজাল রোধ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বাজার তদারকি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রাখার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন ভোক্তাদের সঠিক ওজন ও পরিমাপ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বিএসটিআই–এর পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সচেতন মহলের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। পরিশেষে, তিনি একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অংশীজনদের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।

