দিন যতই গড়াচ্ছে, বাতাসে ভাসছে পূজা পূজা গন্ধ। ক্যালেন্ডার বলছে শারদোৎসব কড়া নাড়ছে দরজায়। পূজার এই দিনগুলো শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি আনন্দ, সংস্কৃতি, মিলনমেলা এবং নিজেকে নতুনভাবে প্রকাশ করার বিশাল উৎসব। ষষ্ঠী থেকে দশমী, এই কটি দিন সবার মনেই থাকে অন্যরকম উচ্ছ্বাস। আর এই উৎসবের আনন্দকে দ্বিগুণ করতে ফ্যাশনপ্রেমীদের মনে শুরু হয়ে গেছে সাজসজ্জার আলাদা প্রস্তুতি। পূজার ফ্যাশন নিয়ে লিখেছেন নূপুর পাল
জমকালো শারদ সাজ
গত কয়েক বছর ধরে ফ্যাশন দুনিয়ায় মিনিমালিজম বা কম কারুকাজের একরঙা পোশাকের বেশ কদর ছিল। তবে এবার শারদ ফ্যাশনে সেই শান্ত ও সংযত ধারার পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত এবং প্রাণবন্ত প্রবণতা, যা ম্যাক্সিমালিজম হিসেবে পরিচিত। পুজা মানে আলো, রং এবং উৎসবের আমেজ; তাই পোশাকের ক্ষেত্রেও এখন বড় মোটিফ, পুরো কাপড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নিখুঁত নকশা এবং উজ্জ্বল রঙের দারুণ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ফ্যাশন এখন কেবল পোশাক পরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা হয়ে উঠেছে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। ডোপামিন ড্রেসিংয়ের ছোঁয়ায় আজকের দিনে এমন সব পোশাক বেছে নেওয়া হচ্ছে যা মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। কামিজ, কুর্তা কিংবা ফিউশন পোশাবে তাই এখন বড় ক্যানভাসে রঙের খেলা স্পষ্ট।
ঐতিহ্যের ছোঁয়া
এবারের পূজার ফ্যাশনে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে গেছে দেশীয় ও ঐতিহ্যবাহী কারুকাজ। রাজস্থান ও গুজরাটের ঐতিহ্যবাহী আজরাখ এবং ডাবু প্রিন্টের জ্যামিতিক নকশা এখন দেশীয় সুতি ও সিল্কের কুর্তিতে রাজকীয় ভিন্টেজ লুক এনে দিচ্ছে। পাশাপাশি, স্টোরিটেলিং প্রিন্ট হিসেবে কালামকারী ও পিচওয়াই মোটিফের বড় বড় লতাগুল্ম, ফুল কিংবা ময়ূরের নকশা পোশাকের জমিনে যোগ করেছে ড্রামাটিক ও আর্ট-ইনস্পায়ার্ড ভাইব। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন হাউসগুলোর বোহো-চিক ধারা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফরেস্ট গ্রিন, নেভি ব্লু বা চকোলেট টোনে ভিক্টোরিয়ান ফ্লোরাল এবং বড় সাইজের পেইসলি মোটিফের ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের ফ্যাশনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই ভারী ও অল-ওভার প্রিন্টের পোশাকগুলো যেকোনো ক্যাজুয়াল বা সেমি-ফরমাল আউটফিটকে মুহূর্তেই উৎসবের আমেজে রূপান্তর করতে সক্ষম।
শাড়ি থেকে ফিউশন
দুর্গাপূজার ফ্যাশন মানেই শাড়িÑ এই চিরন্তন ধারণা আজও অটুট। তবে শাড়ির ধরনে এসেছে দারুণ বৈচিত্র্য। অষ্টমী কিংবা দশমীর সাজে লাল পাড় সাদা শাড়ির আবেদন চিরকালীন হলেও, এবার জামদানি, মসলিন, সিল্ক এবং হালকা ওজনের সুতি শাড়িতেও এসেছে নতুন নকশা। শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজের প্যাটার্নেও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। সাধারণ কাটের বাইরে শার্ট, ছোট জ্যাকেট কিংবা ওভারসাইজ শার্টের সঙ্গে শাড়ি পরার ট্রেন্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, তরুণীদের ফ্যাশনে ফিউশন ধারাটি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে। স্কার্টের সঙ্গে শর্ট জ্যাকেট, কুর্তির সঙ্গে পালাজো কিংবা শাড়ির সঙ্গে স্নিকার্স বা আরামদায়ক জুতার মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে উৎসবের ঐতিহ্য বজায় রেখেও আধুনিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় থাকা সম্ভব।
পুরুষদের ক্ল্যাসিক ও ফিউশন
শুধু নারীরাই নন, পুরুষদের পূজার পোশাকেও এসেছে নান্দনিক পরিবর্তন। পাঞ্জাবি বরাবরই ছেলেদের প্রধান উৎসবের পোশাক। তবে সাদা বা ক্রিমের পাশাপাশি মেরুন, ডিপ ব্লু, বাদামি, হলুদ এবং মাটির রঙের পাঞ্জাবিও এখন ফ্যাশনের কেন্দ্রবিন্দুতে। পাতা ও ফুলের সূক্ষ্ম মোটিফ বা গলার কাছে হালকা কারুকাজ পাঞ্জাবির লুকে আনে আভিজাত্য। তরুণরা এখন শুধু চিরায়ত পাঞ্জাবি-পায়জামাতেই আটকে নেই; বরং শর্ট কুর্তার সঙ্গে ট্রাউজার, কিংবা ক্যাজুয়াল শার্ট ও সামার জ্যাকেটের মিশ্র সাজ বেছে নিচ্ছেন। এছাড়া ঐতিহ্যের ছোঁয়া ধরে রাখতে সিল্ক বা বেনারসি কাপড়ের হালকা উত্তরীয় পরার ট্রেন্ডও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা পুরো লুকে যোগ করে এক অনন্য রাজকীয় ভাব।
স্টাইলিংয়ের গোল্ডেন রুলস
পূজার দিনে ম-পে ম-পে ঘোরা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হয়। তাই ফ্যাশনের পাশাপাশি আরামের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। হালকা তাঁত, সুতি, মসলিন বা আরামদায়ক মিশ্র কাপড়ের পোশাক দিনের বেলায় যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনই সন্ধ্যার জমকালো আয়োজনের জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে একটু ভারী পোশাক। তবে ভারী প্রিন্টের পোশাক নিখুঁতভাবে স্টাইল করার কিছু কৌশল জানা জরুরি। যেমন, টপে ভারী প্রিন্ট থাকলে বটমস একদম সলিড বা একরঙা রাখা উচিত, যাতে লুকটি ব্যালেন্সড হয়। গহনা বা মেকআপের ক্ষেত্রে মিনিমালিজম বজায় রেখে ন্যুড বা ন্যাচারাল লুকে সাজলে এবং নিউট্রাল টোনের জুতো-ব্যাগ বেছে নিলে পুরো সাজটাই হয়ে ওঠে মার্জিত ও এলিগ্যান্ট। উৎসবে ফ্যাশন কোনো নির্দিষ্ট গ-িতে আবদ্ধ নয়; এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। নিজের পছন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য আর সৃজনশীলতার আলোয় নিজেকে সাজিয়ে তোলার মাঝেই লুকিয়ে আছে উৎসবের আসল সৌন্দর্য। রঙের ক্যানভাসে এবারের পূজা সবার জন্যই হোক আরও রঙিন, আরও সুন্দর ও আনন্দময়।
