মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে পিস্তল উঁচিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন রাজধানীর স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। সেই ঘটনার জেরে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ, সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা এবং পুলিশের তদন্তের নির্দেশ— সব মিলিয়ে ঘটনাটি তোলপাড় সৃষ্টি করে। ওই ঘটনার রেশে মন্ত্রিত্ব খুইয়েছেন ইশরাক হোসেন। কিন্তু কিছুই বদলায়নি রাজধানীর দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে গেন্ডারিয়া স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পশ্চিম পাশের মাদক কারবারের চিত্র। অভিযান, তোলপাড় কিংবা প্রশাসনিক তৎপরতা— কোনোটিরই স্থায়ী প্রভাব পড়েনি এই মাদক স্পটে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই সেখানে আবার বসেছে মাদকের প্রকাশ্য হাট। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চলছে গাঁজা ও হেরোইনের পুরিয়া বিক্রি। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী ও বৃদ্ধদের উপস্থিতিতে রেললাইনের দুপাশে এমনভাবে মাদক কেনাবেচা চলছে, যেন এটি কোনো সাধারণ নিত্যপণ্যের বাজার।
রেললাইনের পশ্চিম পাশের এলাকায় পা রাখলে প্রথমে মনে হতে পারে, কোনো গ্রামীণ হাটে সওদা চলছে। লোকজনের আনাগোনা, ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর প্রকাশ্যে পণ্য হাতবদলের দৃশ্য— সবই আছে। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়, বিক্রি হচ্ছে মাদক। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই কারবারের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের শেষ নেই। অথচ মাদকবিরোধী অভিযানে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনার পরও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে এই কারবারের শিকড় কতটা গভীরে? সাময়িক অভিযান ও খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের বাইরে গিয়ে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে এই মাদক স্পটের চিত্র বদলাবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি এই চত্বরে পিস্তল উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান চালান স্থানীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তার এই অভিযানের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। ভিডিওতে অস্ত্র উঁচিয়ে ধাওয়া করা এবং এক তরুণকে লাথি মারার দৃশ্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন এবং তিনি পদত্যাগ করেন। একই
সঙ্গে ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেয় মহানগর পুলিশ। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলা সেই ঘটনার পরদিনই মাদক কারবারের পুরনো চেহারা ফিরে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে। তাদের প্রশ্ন, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের মতো বড় ঘটনা ঘটলেও যদি মাদক কারবার বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করেন এমন এক স্কুলশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় কিংবা বিকালে ফেরার পথে রেললাইনের দুপাশে সারি সারি মানুষ বসে থাকতে দেখা যায়। তাদের অনেকেই মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। এ পথ দিয়ে নারী ও মেয়েদের চলাচল করতে চরম অস্বস্তিতে পড়তে হয়। মাদককারবারিরা ক্রেতা ডাকতে এমনভাবে হাঁকডাক করে, যেন খোলাবাজারে সবজি বিক্রি হচ্ছে। পথচারীদের অনেক সময় ক্রেতা ভেবে ডেকে ওঠে তারা। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ওই শিক্ষক বলেন, কয়েকদিন আগে মন্ত্রী সাহেব নিজে অস্ত্র নিয়ে এসেছিলেন। চারদিকে হইচই, চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ি হয়েছে। কিন্তু আজ এসে দেখুন, সব আগের মতোই চলছে। মাদককারবারিদের বসার জায়গা, ক্রেতাদের আনাগোনা কিংবা প্রকাশ্যে বিক্রির দৃশ্য— কোনো কিছুতেই পরিবর্তন নেই। সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি, নিরাপত্তাও বাড়েনি। বড় কোনো ঘটনা ঘটলে কিছু সময়ের জন্য সতর্ক তৎপরতা দেখা যায়, কিন্তু পরে সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
আরেক প্রবীণ স্থানীয় বাসিন্দা নড়িদার মণ্ডল আক্ষেপ করে বলেন, এখানে পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়। কখনও কাউকে ধরে নিয়ে যায়, মামলা হয়। কিন্তু পুলিশ এলাকা ছেড়ে যাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই আবার নতুন মুখে কারবার শুরু হয়ে যায়। যারা ধরা পড়ে, তাদের অনেকে পরে জামিনে বেরিয়ে আসে। এরপর আবার একই জায়গায় বসে মাদক বিক্রি করে। এভাবে বছরের পর বছর একটি এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা চলতে থাকলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়— এই কারবারের পেছনে কারা রয়েছে, কারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?
তার ভাষ্য, এত বড় একটি কারবার দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চলার পেছনে প্রভাবশালী কারও আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। শুধু সামনের সারিতে থাকা বিক্রেতাদের ধরে নিয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। যারা মাদক সরবরাহ করে, কারবার পরিচালনা করে এবং এর মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ আয় করে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে একদল বিক্রেতাকে সরিয়ে দিলে অন্যরা এসে জায়গা দখল করবে। আর সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হবে।
বিকল্প পথ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি ও অস্বস্তি নিয়েই রেললাইনের পাশের এই পথ ব্যবহার করছেন সাধারণ মানুষ। মাদককারবারিদের অবাধ আনাগোনা, ক্রেতাদের ভিড় এবং প্রকাশ্যে বিকিকিনির কারণে পথচারীদের অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী ও শিশুদের এ-পথ দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কারবারিরা পথচারীদেরও সম্ভাব্য ক্রেতা ভেবে ডেকে ওঠে। ফলে এলাকায় মাদক বিক্রির পাশাপাশি জনসাধারণের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এ স্পটে সক্রিয় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের সঙ্গে কথা হয়। অল্প বয়সেই মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এই কিশোর অবলীলায় নিজের কাজের কথা স্বীকার করে। কেন এই পেশায় এসেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলে, পড়ালেখা হি¹ি নাই, বাপে করছে আমরাও করছি। আমাগোর ছাওয়াল পাওয়ালরাও করব এগুলো। তার কথায় উঠে আসে দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও পারিবারিকভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার এক উদ্বেগজনক চিত্র। কিশোরটির দাবি, জীবিকার তাগিদেই সে এই পথে এসেছে। পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও ছাড়া পেয়ে আবার একই জায়গায় ফিরে আসতে হয় তাকে। তার ভাষায়, ‘না খাইয়া মরার চেয়ে এই পথে নামা ছাড়া উপায় ছিল না।’ তবে তার এই বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একটি ১৫ বছর বয়সী কিশোরের এমন বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত অসহায়ত্বের কথাই বলে না, বরং মাদক কারবারের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও সামনে আনে। পারিবারিকভাবে একই কাজে যুক্ত থাকার কথা বলে সে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও এই পথে আসার কথা জানিয়েছে, তা উদ্বেগজনক। শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য ও বিকল্প জীবিকার অভাবের মতো বিষয়গুলো কীভাবে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ পরিবেশে ঠেলে দিতে পারে, তার একটি উদাহরণ এই কিশোর। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এ ধরনের স্পটে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে মাদক বিক্রি চলতে থাকলে আরও অনেক কিশোর এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, মাদক বিক্রি ও সেবনের সঙ্গে জড়িত ৪০ বছরের বেশি বয়সী এক ব্যক্তি জানান, তারা মূলত দিন চুক্তিতে খুচরা পুরিয়া বিক্রি করেন। মাদক সরবরাহের মূল কারবারিরা সামনে না থেকে পেছনে থেকেই পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য, গতকাল মন্ত্রী হঠাৎ এসে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে কয়েকজন দৌড়ে পালিয়েছিল। কিন্তু দিন শেষে পেটের ভাতের ব্যবস্থা করতে হয় তাদেরই। মন্ত্রী এসে তো আর তাদের খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়ে যাবেন না। তাই পরদিন আবার কাজে বসতে হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তির বক্তব্য থেকেও মাদক সরবরাহের মূল উৎস বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে খুচরা বিক্রেতা ও মাদক সরবরাহের মূল চক্রের মধ্যে সম্ভাব্য ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এসেছে। যারা রেললাইনের পাশে বসে অল্প পরিমাণে মাদক বিক্রি করে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো তুলনামূলক সহজ। কিন্তু নিয়মিত সরবরাহ, অর্থের লেনদেন এবং পুরো কারবার পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা না গেলে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে স্থায়ী ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। স্থানীয়দের অভিযোগও মূলত সেখানেই। তাদের মতে, অভিযান হলে সামনের সারির কয়েকজন বিক্রেতা সরে যায়, কিন্তু মাদকের সরবরাহ ও কেনাবেচার ব্যবস্থা অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সচল হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। গেন্ডারিয়া থানার পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রেললাইনের এই অঞ্চলটি খোলা ও উন্মুক্ত হওয়ায় অপরাধীরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে পারে। সেখানে ভাসমান মানুষের আনাগোনাও বেশি। ফলে অভিযান চালিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে একই এলাকায় কিংবা আশপাশের অন্য জায়গায় আবার কারবার শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়। পুলিশের দাবি, তারা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসামি গ্রেপ্তার ও মামলা করছেন। কিন্তু মাদক কারবার পুরোপুরি বন্ধ করতে গিয়ে নানা ধরনের বাস্তব সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান জানিয়েছেন, রেললাইনের ওই এলাকায় মাদক কেনাবেচা হওয়ায় পুলিশ প্রায়ই অভিযান চালায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারও করে। তবে ভাসমান মানুষের আধিক্য ও জায়গাটির উন্মুক্ত অবস্থানের কারণে পুরো চক্রকে দমন করা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশের এই বক্তব্যে নিয়মিত অভিযানের কথা উঠে এলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি কীভাবে চলছে? অভিযান যদি নিয়মিত হয়ে থাকে, তাহলে কেন তার স্থায়ী প্রভাব দেখা যাচ্ছে না? আর যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তারা ফিরে এসে আবার একই কারবারে জড়িয়ে পড়লে সেই চক্র ভাঙার কার্যকর উপায় কী?
দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে গেন্ডারিয়া স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পশ্চিম পাশের এই মাদক স্পটের বাস্তবতা বলছে, সাময়িক তৎপরতা দিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করা যাচ্ছে না। পিস্তল উঁচিয়ে আলোচিত অভিযান, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ কিংবা পুলিশের তদন্তের নির্দেশ— সবকিছুই ঘটেছে। কিন্তু মাদক কারবারের জায়গাটিতে তার স্থায়ী কোনো ছাপ পড়েনি। ঘটনার পরদিনই আবার আগের মতো বিকিকিনি শুরু হওয়া সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু লোক দেখানো অভিযান বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ না থেকে মাদক সরবরাহের উৎস, অর্থের লেনদেন এবং কারবার পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের এই চক্রে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও বিকল্প জীবিকার বিষয়েও নজর দিতে হবে। কারণ, মাদকের হাটে সাময়িকভাবে লোকজন সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না; সরবরাহ ও বিক্রির ব্যবস্থা অক্ষত থাকলে নতুন বিক্রেতা এসে আবারও জায়গা দখল করে। গেন্ডারিয়ার রেললাইনের পাশের মাদক স্পটটি যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি— আলোড়ন সৃষ্টি হয়, অভিযান চলে, বড় সিদ্ধান্তও আসে; কিন্তু দিন শেষে মাদকের হাটে আঁচড়টুকুও পড়ে না।
