ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে প্রয়োজনে আরও হামলা চালানো হতে পারে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে আলোচনা করতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বৈঠকে বসেছেন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এদিকে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা
ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে সৌদি আরবের একাধিক আন্তর্জাতিক আয়োজন স্থগিত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আগেই শুরু করা উচিত ছিল। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘ব্যাপকভাবে পর্যুদস্ত করেছে’ এবং প্রয়োজনে আরও কিছু হামলা চালাতে পারে। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমত প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, একদিকে মানুষ তার পদক্ষেপকে সমর্থন করছে, কারণ আগের প্রেসিডেন্টদের যে কাজ করা উচিত ছিল, তিনি তা করছেন। অন্যদিকে, এ নিয়ে মানুষের ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। যুদ্ধ শুরুর সময়ই এর জন্য মূল্য দিতে হবে বলে তিনি বুঝেছিলেন বলেও জানান।
এর আগে বুধবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কোনো আলোচনা চলছে না। তবে পরিস্থিতির বিষয়ে ‘একভাবে বা অন্যভাবে’ মোটামুটি শিগগিরই কিছু ঘটবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী— দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ওই পরিকল্পনায় অনুমোদন দেবেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সঙ্গে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি, যা দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
যুদ্ধ বন্ধ করে স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করতে গত জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের কারণে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
ইরানযুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে শুক্রবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বৈঠকে বসেছেন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। বৈঠকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক, মিসর, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত বাড়লে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না। এতে জ্বালানি তেলের দামেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইস্তাম্বুলে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও উত্তেজনা তৈরি হলে কোনো বিজয়ী থাকবে না। এর ফলে হাইড্রোকার্বন বা জীবাশ্ম জ্বালানির দামেও গুরুতর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের মধ্যে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীদের হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের তেল ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই) ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। সম্মেলনটি ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
একই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের বিশ্ব ডেটা ফোরাম এবং দ্বিতীয় সৌদি পরিসংখ্যান ফোরামও ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। রিয়াদে ৯ থেকে ১২ নভেম্বর এসব আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার সৌদি আরবের পরিসংখ্যানবিষয়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানায়। আন্তর্জাতিক বক্তা, বিশেষজ্ঞ ও অংশীদারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রত্যাশিত মানের আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এর আগে সৌদি আরবে সিক্স কিংস স্ল্যাম টেনিস টুর্নামেন্ট এবং বিশ্ব র্যালি চ্যাম্পিয়নশিপের সৌদি আরব পর্বও বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের হামলা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানযুদ্ধের পাশাপাশি ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। এতে দেশটির তায়েজ শহর ও আশপাশের এলাকায় খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, চলমান সংঘাত, সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে ইয়েমেনে প্রায় ৮ লাখ মানুষ জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে তায়েজ শহরের ৬ লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ লাখের বেশি নারী ও শিশু।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় জানিয়েছে, তায়েজে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় প্রায় ২০ দিন ধরে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শহরটির বাসিন্দাদের জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে পানি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পানি সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলোতে বিঘ্ন ঘটায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষের পানি পাওয়ার ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে পড়েছে। পাশাপাশি আবর্জনা অপসারণ ব্যাহত হওয়ায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরানপন্থি হুথিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। এতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহপথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের চাপ বেড়েছে।
