‘সুখবর! সুখবর! সুখবর!’—মাইকের এমন বিকট শব্দে প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার অনেক মানুষের। বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে চিকিৎসকের উপস্থিতির প্রচার, কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন, দোকান ও শোরুম উদ্বোধন, হারানো জিনিসের ঘোষণা এবং মুরগির মাংস ও মোবাইল সিম বিক্রির প্রচারে দিনভর চলছে মাইকিং।
সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলা এসব প্রচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বাসিন্দারা। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জনজীবন।
উপজেলার প্রধান সড়ক, অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের হাটবাজারে ভ্যান ও ইজিবাইকে একাধিক মাইক ও সাউন্ড বক্স বেঁধে চালানো হচ্ছে এসব প্রচার। উচ্চশব্দে মাইকিংয়ের কারণে ঘরের ভেতরেও স্বস্তি মিলছে না অনেকের। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। পাশাপাশি শিশু, বয়স্ক, হৃদ্রোগী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশ্রামেও বিঘ্ন ঘটছে। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাভাবিক কথাবার্তা বলাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভ্যানচালকদের দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো উপজেলায় এসব মাইকিং চালানো হচ্ছে। কিন্তু শব্দের মাত্রা ও প্রচারের সময় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি দেখা যাচ্ছে না। ফলে জনদুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। প্রচারের প্রয়োজনে মাইক ব্যবহার করা হলেও শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট সময় মেনে চলা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
সদর ইউনিয়নের খোরশেদ আলম বলেন, “উচ্চশব্দে মাইকিংয়ের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। প্রচারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।”
শুটিবাড়ি বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল বাতেন বলেন, “মাইকের বিকট শব্দে বাজারে ক্রেতাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হয়। ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে মাইকিংয়ের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।”
ডালিয়া নতুন বাজার এলাকার মনোয়ার হোসেন বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাইকিং চলায় ঘরে থাকা অবস্থায়ও অনেক সময় স্বস্তি পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।”
চাপানিরহাট এলাকার আব্দুল করিম বলেন, “উচ্চশব্দের কারণে শিশুদের পড়াশোনা এবং বয়স্কদের বিশ্রামে সমস্যা হতে পারে। তাই প্রচারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় ও শব্দের মাত্রা মেনে চলা উচিত।”
শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম ও শিক্ষক আব্দুল জলিল জানান, সকাল ও সন্ধ্যায় পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাইকের বিকট শব্দে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে তাঁরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য উচ্চশব্দ বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে জনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দেশে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ কার্যকর রয়েছে। বিধিমালায় এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জনপরিসরে মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য অনুমতি ও বিধিনিষেধ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এসব বিধান বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আতিকুর রহমান খান বলেন, অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য উচ্চশব্দ ক্ষতিকর। তাই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাইকিংয়ের শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান জানান, শব্দদূষণ রোধে শিগগিরই মাইকিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ লিখিত চিঠি দেওয়া হবে। নির্দেশনা অমান্য করে অনিয়ন্ত্রিত শব্দ সৃষ্টি করলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ডিমলায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক হবে এবং সাধারণ মানুষও স্বস্তিতে দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে পারবেন।
