বাংলাদেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানির খরচ কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্দরের অদক্ষতা ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার জটিলতা। চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমস ও ব্যাংকিং সেবার সমন্বয়হীনতা, খালি কনটেইনারের স্তূপ এবং সড়কনির্ভর পরিবহনব্যবস্থার কারণে বাড়ছে ব্যবসার খরচ। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, রপ্তানির সময়সীমা, পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর।
এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তিকে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সরকার।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ডিজিটাল সেবা চালুর মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানো হচ্ছে। তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নতুন টার্মিনাল কিংবা প্রযুক্তি চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বন্দরের সঙ্গে কাস্টমস, ব্যাংক, পরিবহন, ডিপো ও শিপিং এজেন্টদের কার্যক্রম সমন্বিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে আসতেই টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে চুক্তিকে ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ বলা সস্তা ও অমূলক কথা। এটি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি। মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ চাইলে চুক্তি নবায়ন করবে, অন্যথায় এর অবসান ঘটাবে। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে হবে।
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে না পারলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হবে। এ কারণেই সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে চায়। মন্ত্রী আরও জানান, সরকার নিশ্চিত হয়েছে যে টার্মিনাল পরিচালনার পরিবর্তনে বর্তমানে বন্দরে কর্মরত কারও কর্মচ্যুতি ঘটবে না। দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে কর্মীদের পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর ফলে আগে বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে যেসব কাজ করতে হতো, সেগুলো এখন একই ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে করা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে বন্দর, কাস্টমস, ব্যাংক, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রম একটি প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দর চেয়ারম্যান আরও বলেন, আগে যে কাজে পাঁচ দিন লাগত, নতুন ব্যবস্থায় তা আধঘণ্টায় করা সম্ভব হবে।
প্রি-অ্যারাইভাল প্রক্রিয়া, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন অনুমোদনের কাজও অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে সময় বাঁচবে, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমবে এবং কাজের জবাবদিহি বাড়বে। পর্যায়ক্রমে কাগজবিহীন কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যও রয়েছে কর্তৃপক্ষের। এর পাশাপাশি বন্দরের সেবা গ্রহণ সহজ করতে নতুন ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিকস ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। এই ব্যবধান উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করছে। আমদানি করা কাঁচামালের খরচ বাড়ার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও এর চাপ পড়ছে। তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি আমদানি কনটেইনার ইয়ার্ডে গড়ে ছয় থেকে আট দিন পড়ে থাকে। কলম্বো কিংবা হো চি মিন সিটিতে একই কাজ শেষ করছে দুই থেকে তিন দিনে।
এই বাড়তি সময়ের কারণে কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছাতে দেরি হয়, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং রপ্তানির নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়। সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করছে।
আমদানি করা কাঁচামালের খরচ বাড়ার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও এর চাপ পড়ছে। তার মতে বন্দর, কাস্টমস, রেল, সড়ক, নৌপথ, ব্যাংক ও শিপিং খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে একটি শক্তিশালী জাতীয় লজিস্টিকস কাউন্সিল বা সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন।
