অপ্রতিম হত্যা: ৩১ দিনে অভিযোগপত্র, চার আসামির দুজনই কিশোর
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় দুই কিশোরসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ৩১ দিনের মাথায় গত ২০ অক্টোবর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এখন বিচার শুরুর অপেক্ষায় অপ্রতিমের পরিবার। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত বিচার শেষে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, ২০ অক্টোবর দুই কিশোরসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
অপ্রতিমের বাবা ও মামলার বাদী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, তিন দিন আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তখন তাঁকে জানানো হয়েছিল, পূজার ছুটি শেষ হওয়ার পরপরই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, “বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে জানান, আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। বিষয়টি তাঁরা আমাদের অবহিত করেছেন। এর বাইরে আমি আর কিছুই জানি না।”
ছেলেকে হারানোর বেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, “অপ্রতিমকে ঘিরেই আমাদের বাঁচার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন তারা কেড়ে নিয়েছে। আমরা খুনিদের দ্রুত বিচার দেখতে চাই। আশা করি, আদালতে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। এখন আমাদের একটাই চাওয়া, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি।”
অভিযোগপত্রে চার আসামির নাম
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব আহমেদ মামলাটির দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তদন্ত করেন। অভিযোগপত্রে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), মো. সিয়াম (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী, দুই কিশোরকে অভিযোগপত্রে শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান অভিযুক্ত। অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনায় সিয়ামও যুক্ত ছিলেন। তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সিয়ামের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগও আনা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, তুহিন এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। অন্যদিকে, সিয়ামের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রের বিস্তারিত এখনো হাতে পায়নি অপ্রতিমের পরিবার। বিশেষ করে দুই কিশোরের বয়স নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে তাদের। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত বয়স নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছিল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে পরিবার।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, পুলিশ সুপারের দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার এবং গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শেষ করে ৩১ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির কারণে অভিযোগপত্র দাখিলের পরপরই আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়নি। পুলিশ সূত্র জানায়, ২০ অক্টোবর অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হলেও ছুটি শেষে রোববার থেকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।
যেভাবে হত্যা করা হয় অপ্রতিমকে
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরের কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। সে কোটবাড়ির বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
মামলার তদন্তে পুলিশ প্রথমে প্রধান অভিযুক্ত তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তদন্তে সিয়ামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি তার বাসার খাটের তোশকের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
নিখোঁজ হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে তুহিনকে শনাক্ত করার কথা জানায় পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে অন্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশের ভাষ্য।
