দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও সরকারি গুদামে মজুদ বাড়লেও নিশ্চিত হচ্ছে না সবার খাদ্যনিরাপত্তা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ পড়তে পারেন জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে। অন্যদিকে, চালের উৎপাদনে স্বস্তি থাকলেও গমের চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বাড়তি সার, জ্বালানি ও সেচের খরচ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে; অথচ ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। ফলে খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত জোগান ও সরকারি মজুদ সত্ত্বেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা এবং পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর সমৃদ্ধি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ ১৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। কৃষিতে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে এ দিবসে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, বাজারব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এফএওর ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত
বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দেশে ধানের উৎপাদন প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ টন হতে পারে, যা গত চার বছরের গড় উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন হয়েছে আনুমানিক ৩ কোটি ১৯ লাখ টন। আউশের উৎপাদন প্রায় ৪১ লাখ টন। আমন মৌসুমে উৎপাদন হতে পারে প্রায় ২ কোটি ৫৯ লাখ টন।
তবে উৎপাদনের এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণিবিন্যাসের (আইপিসি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে এ সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।
এফএওর প্রতিবেদনে সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বন্যায় জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও মানুষের একটি বড় অংশের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহের সামর্থ্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে খাবার কেনায়। ফলে অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি অনেক পরিবারকে খাবারের পরিমাণ ও মানের ক্ষেত্রেও আপস করতে হচ্ছে।
খাদ্যনিরাপত্তা শুধু খাদ্যের পর্যাপ্ত জোগানের ওপর নির্ভর করে না; মানুষের নিয়মিত খাবার কেনার সামর্থ্যও এর গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বাজারে চাল, গম ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বেড়ে গেলে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় এ সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
গত ৭ অক্টোবর ঢাকায় আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিআইএমএমওয়াইটি) আয়োজিত এক বিশেষজ্ঞ বৈঠকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোগ্রাম প্রধান জেসি উড জানান, দরিদ্র শহুরে ও কৃষক পরিবারসহ প্রায় আড়াই কোটি মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন না। তিনি পুষ্টি-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা, কৃষিতে বৈচিত্র্য এবং কৃষক-সহায়তা কার্যক্রমের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি পুষ্টি নিশ্চিত করতে হলে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দেশের খাদ্যনিরাপত্তার চিত্রে চাল ও গমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন ছিল প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ টন। এর বিপরীতে বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ টন।
অন্যদিকে, দেশে বছরে প্রায় ৮০ লাখ টন গমের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ২৩ হাজার টন। গত অর্থবছরে আমদানি করতে হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ ৮১ হাজার টন গম। অর্থাৎ, গমের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বেড়ে গেলে কিংবা আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে খাদ্যশস্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারদর সহনীয় পর্যায়ে রাখতে আমদানির উৎস ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও আয়। চলতি আমন মৌসুমে সার, বিদ্যুৎ ও ডিজেলের বাড়তি খরচ কৃষকের ওপর চাপ তৈরি করছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকের আয় কমে যায়। এতে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সব ধরনের উৎপাদনেই প্রভাব ফেলে। উৎপাদন খরচ কৃষকের সামর্র্থ্যরে বাইরে চলে গেলে তিনি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারেন। এতে চাল উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা ও বাজারদর বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তার মতে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি উপকরণে সহায়তা, সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং দাম সহনীয় রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও উৎপাদন ও কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তার মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরছে। নওগাঁর মহাদেবপুরের আউশচাষি রাসেল হোসেন জানান, প্রায় ১১ বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করে তিনি উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম পেয়েছেন। তার হিসাবে, প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা, অথচ বিক্রির আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার টাকা।
অর্থাৎ, প্রতি বিঘায় তার লোকসান হয়েছে আনুমানিক ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। ভালো ফলন পাওয়ার পরও এমন লোকসান কৃষকের আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়ায়। উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত আয় না থাকলে পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগ, কৃষি উপকরণ কেনা এবং চাষাবাদ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
খাদ্য সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের গুদামে বর্তমানে প্রায় ১৯ লাখ ৬৪ হাজার টন চাল এবং ৩ লাখ ১২ হাজার টনের বেশি গম রয়েছে। ধানসহ মোট খাদ্যশস্যের মজুদ ২৩ লাখ ৪৫ হাজার টনের বেশি।
সরকার ভবিষ্যতের চাহিদা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্যশস্য মজুদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন বলেন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্যশস্য মজুদের সক্ষমতা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের ন্যায্য আয়, বাজারদর সহনীয় রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা— সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ সহজ করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে চালের পাশাপাশি গমসহ অন্যান্য খাদ্যশস্যের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী এবং পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে পুষ্টির বিষয়টিকে যুক্ত করে নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করাও জরুরি।
খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত জোগান তখনই মানুষের জীবনে প্রকৃত সুফল বয়ে আনবে, যখন কৃষক উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের সামর্র্থ্যরে মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারবেন। উৎপাদন ও মজুদ বৃদ্ধির অর্জনকে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। এফএওর সহযোগিতায় প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটি উদযাপন করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। দিবসটি সামনে রেখে কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের।
