ছাত্রলীগের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক থেকে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক কল্লোল
স্বপ্নীল সরদার
ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। মিছিল-মিটিং করেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে। সেই সুবাদে কলেজের গণ্ডি না পেরোতেই জায়গা করে নেন ছাত্রলীগের কমিটিতে। পান শহীদ মশিয়ুর রহমান ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের পদ। অথচ সময়ের পালাবদলে সেই আরাফাত কল্লোল এখন ঝিকরগাছা উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। রাজনৈতিক পরিচয়ের এই পরিবর্তন ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বদল নয়, উপজেলা যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পর একের পর এক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পাওয়া, সরকারি সারের ডিলার নিয়োগ এবং আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হওয়ার প্রচারণা—সব মিলিয়ে ঝিকরগাছার রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে তিনি। স্থানীয়ভাবে অনেকেই তাকে চেনেন ‘ভাবির দেবর’ পরিচয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানা মুন্নির পারিবারিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ ও সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
বলছি যশোরের ঝিকরগাছা পৌরসভার কীর্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা আরাফাত কল্লোলের কথা। তিনি গুপ্তহত্যার শিকার উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলামের ছোট ভাই। সেই সূত্রে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানা মুন্নির দেবর হিসেবে যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) নির্বাচনী এলাকায় তার পরিচিতি রয়েছে।

ছাত্রলীগের কমিটিতে ছিলেন কল্লোল :
১৯৯৮ সালের ৭ মে ঝিকরগাছা উপজেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রফিকুল ইসলাম বাপ্পী ও সাধারণ সম্পাদক শামীম রেজার স্বাক্ষরে শহীদ মশিয়ুর রহমান ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কমিটি প্রকাশ করা হয়। ওই কমিটিতে সেলিম রেজাকে সভাপতি এবং কামরুজ্জামান মিন্টুকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। একই কমিটিতে ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান আরাফাত কল্লোল।
অভিযোগের বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, ১৯৯৮ সালে গঠিত ওই কমিটি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়নি কিংবা নতুন কোনো কমিটিও গঠন করা হয়নি। কমিটির কোনো সদস্যের পদত্যাগের তথ্যও পাওয়া যায়নি।
কলেজ শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন একাধিক নেতার ভাষ্য, আরাফাত কল্লোল ছাত্রজীবনে সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন একসঙ্গে মিছিল-মিটিং ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক নেতা জানান, কিছুদিন আগে কল্লোল তাকে ফোন করে ওই কমিটির কোনো নথিপত্র সংরক্ষিত আছে কি না জানতে চান। নথি থাকলে তা যেন কোনোভাবেই অন্য কারও হাতে না পৌঁছায়, সে অনুরোধও করেন বলে দাবি করেন তিনি।
কমিটিতে থাকা একাধিক ছাত্রলীগ নেতা জানান, ‘ছাত্রজীবনে আমরা একসঙ্গেই ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করি।’ তারা বলেন, আরাফাত কল্লোল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি ছাড়েননি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরাফাত কল্লোল। তার দাবি, তিনি কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতি করেননি। যদিও তৎকালীন সময়ে শহীদ মশিয়ুর রহমান ডিগ্রি কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন।

যুবদলের সাধারণ সম্পাদক, বাদ পড়েন পুরোনো পরীক্ষিত নেতা :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবিরা সুলতানা মুন্নি। সে সময় উপজেলা যুবদল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ ধানের শীষের প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এ পরিস্থিতিতে উপজেলা যুবদলের আগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ঝিকরগাছা উপজেলা যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত ওই কমিটিতে আরাফাত কল্লোলকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরে ধানের শীষের প্রার্থীর সুপারিশে দ্রুত নতুন আংশিক কমিটি গঠন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নতুন কমিটিতে নাজমুল হক নাজুকে সভাপতি এবং প্রার্থীর দেবর আরাফাত কল্লোলকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাদ পড়েন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা মোনাজ্জেল হোসেন লিটন।
একই সময়ে ছাত্রদলের আহ্বায়ক আশরাফুল আলম রানা ও সদস্যসচিব বিপ্লব হোসেনকে শোকজ করা হয়। পরে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকায় গিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে তারা দলীয় পদ ধরে রাখতে সক্ষম হন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এক ব্যক্তির কাঁধে একাধিক দায়িত্ব :
উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন আরাফাত কল্লোল। বর্তমানে তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব এবং ঝিকরগাছা স্পোর্টস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া সম্প্রতি সরকারি সার ডিলার নিয়োগেও তার নাম উঠে এসেছে। ঝিকরগাছা পৌরসভার অনুমোদিত সার ডিলার হিসেবে ‘মেসার্স সেতু এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। তবে তার সার ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি সরকারি সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রচলিত নিয়ম ও যোগ্যতার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই তিনি এ সুযোগ পেয়েছেন।
এ নিয়ে ঝিকরগাছা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘ঝিকরগাছায় সার ডিলার নিয়োগে অনভিজ্ঞরাই চূড়ান্ত মনোনীত। বঞ্চিত প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’
এবার মেয়র হওয়ার স্বপ্ন :
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের পাশাপাশি এবার ঝিকরগাছা পৌরসভার মেয়র হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন আরাফাত কল্লোল। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে তাকে মেয়র হিসেবে দেখতে চেয়ে প্রচারণা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার অনুসারী নেতাকর্মীরা ‘মেয়র হিসেবে দেখতে চাই’ লেখা প্যানা তৈরি করে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদ সদস্যের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক এবং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার কারণে ঝিকরগাছার স্থানীয় রাজনীতিতে কল্লোলের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা থেকে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক, এরপর ক্রীড়া সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, সরকারি সার ডিলার এবং সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী—আরাফাত কল্লোলের এই উত্থান ঝিকরগাছার রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয়, বর্তমান দলীয় অবস্থান এবং ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক যোগ্যতা নাকি পারিবারিক প্রভাব কাজ করেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্থানীয় রাজনৈতিক মহল।
যা বলছেন যুবদলের জেলা নেতারা :
বিষয়টি জানতে চাইলে যশোর জেলা যুবদলের আহ্বায়ক এম তমাল আহমেদ ও সদস্যসচিব আনছারুল হক রানা বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় কমিটি হঠাৎ করে আগের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন করেছে। বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তারা অবগত নন। তবে বিষয়টি তদন্ত করে কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানানো হবে বলে জানান তারা।
অন্যদিকে, ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আরাফাত কল্লোল বলেন, ‘আমি কখনোই ছাত্রলীগের রাজনীতি করিনি।’ তবে তিনি ওই সময়ে শহীদ মশিয়ুর রহমান ডিগ্রি কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন বলে জানান। তিনি বলেন, আওয়ামী শাসনামলে আমাকে ৫০টিরও অধিক নাশকতা মামলা দেওয়া হয়েছে। সে সময় আমার মতো অসুবিধায় কেউ ছিল না। সারের ডিলারসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নির্যাতিত নেতা হিসেবে এটুকু সুবিধা তো আমি দলের কাছে আশা করতেই পারি।
জানতে চাইলে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ও আরাফাত কল্লোলের ভাবি সাবি সুলতানা মুন্নিকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোর্তজা এলাহী টিপু বলেন, নির্বাচনের আগে ধানের শীষের প্রার্থী উপজেলা যুবদলের কমিটি ভেঙে দিয়ে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে নিজের মতো করে কমিটি করেছে। সেখানে কল্লোল সাধারণ সম্পাদক হয়েছে। তারা প্রভাবশালী পরিবার। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। তাই এ বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।
