হুমায়ুন কবির সুমন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেলে কাপড়ের গাঁটরি বেঁধে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন ৫০ বছর বয়সী সিরাজুল ইসলাম। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে কাপড় বিক্রি করেন তিনি। কখনো বিক্রি ভালো হয়, আবার কখনো আশানুরূপ ক্রেতা মেলে না। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। এই কাপড় বিক্রির আয়েই চলে তাঁর সংসার।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ঘোপালপুড় গয়হাট্টা পূনিমাগাঁতী গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম। প্রায় ২০ বছর ধরে সাইকেলে কাপড় নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। তাঁর নেই কোনো স্থায়ী দোকান, নেই বড় ব্যবসা। সাইকেল আর কাপড়ের গাঁটরিই তাঁর বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
প্রতিদিন সকালে কাপড়ের গাঁটরি সাইকেলে বেঁধে বেরিয়ে পড়েন সিরাজুল। গ্রামের মেঠোপথ কাঁচা পাকা রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছে যান বিভিন্ন পাড়ায়। বাড়ির উঠানে কিংবা রাস্তার পাশে সাইকেল থামিয়ে ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরেন কাপড়। ছোট বড় সবার প্রয়োজন অনুযায়ী কাপড় বিক্রির চেষ্টা করেন তিনি। এভাবেই দীর্ঘ দুই দশকে গ্রামাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তাঁর পরিচিতি।
সিরাজুলের সাথে একান্ত কথা হলে তিনি বলেন , প্রতিদিন তাঁর কাপড় বিক্রি হয় প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকার। তবে বিক্রির পরিমাণ সব দিন সমান থাকে না। কোনো দিন লাভ হয় মাত্র ৩০০ টাকা, আবার কোনো দিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এই সামান্য লাভ দিয়েই তাঁকে সংসারের খরচ মেটাতে হয়।
সিরাজুল ইসলামের চার ছেলে মেয়ে। কাপড় বিক্রি ও কিছু জমি চাষ করে সেই উপার্জিত অর্থ দিয়ে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে এক মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।
৫০ বছর বয়সেও প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া সহজ কাজ নয়। রোদ বৃষ্টি কিংবা শারীরিক ক্লান্তি সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই তাঁকে পথে নামতে হয়। কোনো দিন বিক্রি ভালো হলে মনে কিছুটা স্বস্তি আসে, আবার কোনো দিন কম লাভ নিয়ে ফিরতে হয় বাড়িতে। তারপরও পরের দিনের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নেন তিনি।
সিরাজুল ইসলাম আরো বলেন, ২০ বছর ধরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাপড় বিক্রি করছি। এই ব্যবসা করেই সংসার চালাই। কোনো দিন লাভ একটু বেশি হয়, আবার কোনো দিন কম হয়। তবু সংসারের কথা চিন্তা করে প্রতিদিন বের হতে হয়। কাপড় বিক্রি করেই দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এখন এক মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাচ্ছি।
গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে সিরাজুলের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবদান নীরব হলেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বাড়ির কাছেই মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেন। অন্যদিকে নিজেদের শ্রম ও পরিশ্রমের বিনিময়ে চালিয়ে নেন সংসার। বড় ব্যবসা কিংবা পুঁজির জোর না থাকলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেন তাঁরা।
সিরাজুল ইসলামের জীবন যেন গ্রামবাংলার হাজারো পরিশ্রমী মানুষের প্রতিচ্ছবি। সাইকেলের দুই চাকা, কাপড়ের গাঁটরি আর প্রতিদিনের দীর্ঘ পথচলা এই নিয়েই তাঁর জীবন। স্বপ্ন বড় কিছু নয় পরিশ্রম করে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটানো আর সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা। এই পথচলা শুধু জীবিকার গল্প নয় এটি দায়িত্ব পরিশ্রম আর টিকে থাকার এক নিরন্তর সংগ্রাম।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
