হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা যে কোনও সময় দেখা দিতে পারে। হঠাৎ বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব করার পর কেউ জ্ঞান হারালে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে প্রতি মুহূর্তের গুরুত্ব অপরিসীম। দ্রুত সিপিআর শুরু করা এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা রোগীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কী?
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হল এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে হৃদ্যন্ত্র হঠাৎ কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পৌঁছনো ব্যাহত হয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রোগী অচেতন হয়ে পড়তে পারেন এবং তার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়। হার্ট অ্যাটাকে সাধারণত হৃদ্যন্ত্রের কোনও অংশে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদ্যন্ত্রের কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। হার্ট অ্যাটাক কখনও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ হতে পারে।
রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে কী করবেন?
কেউ হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে প্রথমে দেখুন, তিনি ডাকলে সাড়া দিচ্ছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না। শ্বাস নিতে হাঁসফাঁস করা বা অনিয়মিতভাবে শ্বাস নেওয়াকে স্বাভাবিক শ্বাস বলে ধরে নেবেন না।
রোগী সাড়া না দিলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে বলে সন্দেহ করুন। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবায় ফোন করুন। বাংলাদেশে জরুরি সহায়তার জন্য ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা যায়। আশপাশে কেউ থাকলে তাকে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করতে বা স্বয়ংক্রিয় বহিঃস্থ ডিফিব্রিলেটর (এইডি) খুঁজে আনতে বলুন।
কী ভাবে সিপিআর দেবেন?
প্রশিক্ষণ জানা থাকলে অবিলম্বে সিপিআর শুরু করুন। প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে রোগীকে শক্ত ও সমতল জায়গায় চিত করে শোয়ান। বুকের মাঝখানে, বুকের হাড়ের ওপর এক হাতের তালুর গোড়া রাখুন। অন্য হাতটি তার ওপর রেখে আঙুল জড়িয়ে ধরুন। কনুই সোজা রেখে শরীরের ওজন ব্যবহার করে বুকের ওপর জোরে ও দ্রুত চাপ দিন। প্রতি মিনিটে ১০০–১২০ বার চাপ দিতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে বুক প্রায় ৫–৬ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত চাপুন এবং প্রতিবার চাপ দেওয়ার পর বুককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দিন।
প্রশিক্ষণ থাকলে ৩০ বার বুক চাপ দেওয়ার পর দু’বার মুখে শ্বাস দেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। প্রশিক্ষণ না থাকলে বা মুখে শ্বাস দিতে অসুবিধা হলে একটানা বুকের ওপর চাপ দিতে থাকুন। এইডি পাওয়া গেলে যন্ত্রটির নির্দেশ অনুসরণ করুন। চিকিৎসাকর্মী এসে দায়িত্ব নেওয়া, রোগীর স্বাভাবিক শ্বাস ফিরে আসা বা শারীরিকভাবে আর চালিয়ে যেতে না পারা পর্যন্ত সিপিআর চালিয়ে যান।
রোগী অচেতন হলেও যদি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেন, তবে বুক চাপ দেবেন না। জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন এবং তার শ্বাসপ্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না?
বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, বমি, মাথা ঘোরা কিংবা হঠাৎ দুর্বলতা এগুলো হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। সব রোগীর ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না। কখনও ব্যথা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে গ্যাস বা বদহজম ভেবে অপেক্ষা করবেন না। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন। রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন-সহ কোনও ওষুধ দেবেন না।
কেন প্রতি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ?
কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত সিপিআর শুরু করা এবং প্রয়োজনে ডিফিব্রিলেটর ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। যত দ্রুত জরুরি চিকিৎসা শুরু হয়, রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়তে পারে।
পরিবারের সদস্যদের সিপিআর শেখা থাকলে বিপদের মুহূর্তে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবেন। তবে সিপিআর চিকিৎসকের বিকল্প নয়। এটি জরুরি চিকিৎসা পৌঁছনোর আগ পর্যন্ত জীবন বাঁচানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।