কানাডার তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশে গণভোট হবে কি না, সেই লক্ষ্যে আগাম গণভোট হয়েছে। আর সেই গণভোটে আলবার্টার মানুষ জানিয়ে দিলেন, কোনো গণভোটের দরকার নেই। তাঁরা কানাডার সঙ্গেই আছেন, থাকবেন।
আলবার্টা প্রদেশ কানাডা থেকে স্বাধীন হতে চায় কি না এবং সেই প্রশ্নে একটি বাধ্যতামূলক গণভোটের আয়োজন করা হবে কি না, তা জানতে গতকাল সোমবার গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
ফলাফল প্রকাশের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার লক্ষ্যে গণভোট আয়োজনের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আলবার্টার মানুষ তাঁদের ‘পরিষ্কার পছন্দের’ কথা জানিয়ে দিয়েছেন।
ভোটের আগে জনমত জরিপে দেখা গেছে, কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রদেশের এক–চতুর্থাংশের কম মানুষ স্বাধীনতা চান। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিচ সিলভেস্টার গতকাল সোমবারও এএফপিকে বলেছেন, তিনি এখনো আশাবাদী।
এমন এক সময়ে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে, যখন প্রতিবেশী দেশের প্রেসিডেন্ট ক্রমাগত কানাডাকে তাঁর দেশের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, ভোট আয়োজনের জন্য এই সময় ‘সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ’ ছিল।
নিজের এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে মার্ক কার্নি আরও বলেন, জাতীয় পর্যায়ে স্থিতিশীলতা এখন অত্যন্ত জরুরি। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার হুমকিও দিচ্ছেন।
গতকাল স্থানীয় সময় রাত আটটায় ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। প্রদেশটিতে ভোটার সংখ্যা ৩১ লাখ।
এর আগে ভোটের আগে জনমত জরিপে দেখা গেছে, কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রদেশের এক–চতুর্থাংশের কম মানুষ স্বাধীনতা চান। তবে স্বাধীনতাপন্থী নেতা মিচ সিলভেস্টার গতকাল বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, তিনি এখনো আশাবাদী।
আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্টের প্রধান সিলভেস্টার প্রাদেশিক রাজধানী এডমন্টনের একটি রেস্তোরাঁয় তাঁর পক্ষের লোকজন নিয়ে ভোটের ফলাফলের ওপর নজর রাখছিলেন।
সেখানে জড়ো হওয়া সমর্থকদের উদ্দেশে সিলভেস্টার বলেন, ‘আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। কিন্তু আজ রাতেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আমরা এই প্রদেশে কিছু একটা জাগিয়ে তুলেছি, আর সেই চেতনা কোথাও চলে যাচ্ছে না।’
প্রদেশজুড়ে জাতীয় ঐক্যের পক্ষে প্রচার চালানো ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ সংগঠনের প্রধান টমাস লুকাশুক বলেন, ‘কানাডিয়ানদের মধ্যে যে উৎসাহ ও দৃঢ়তা দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ।’
আলবার্টার রক্ষণশীল প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বলেন, তিনি স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।
তবে প্রদেশকে বিভক্ত করে রাখা একটি বিষয় নিষ্পত্তির জন্যই এই গণভোট আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান স্মিথ। এবারের ভোটে যদি অধিকাংশ মানুষ কানাডা থেকে আলবার্টার আলাদা হয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন, তাহলে তিনি একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
আলবার্টায় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। আর তেলশিল্প পরিচালনা নিয়ে ক্ষোভ থেকেই প্রদেশটির স্বাধীনতার দাবির পক্ষে বড় ধরনের জনসমর্থন তৈরি হয়েছে।
আর যদি কেন্দ্রের সঙ্গে থাকার পক্ষের ভোট বেশি পড়ে এবং জয়ী হয়, তাহলে আলাদা হয়ে যাওয়ার প্রশ্নটি আর তোলা উচিত হবে না বলে মনে করেন ড্যানিয়েল স্মিথ।

বিদেশের প্রভাব আছে কি
আলবার্টায় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। আর তেলশিল্প পরিচালনা নিয়ে ক্ষোভ থেকেই প্রদেশটির স্বাধীনতার দাবির পক্ষে বড় ধরনের জনসমর্থন তৈরি হয়েছে।
স্মিথের অভিযোগ, কার্নির পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডোই আলবার্টার স্বাধীনতার দাবির আগুন উসকে দিয়েছেন।
নিজের জলবায়ুবিষয়ক নীতি এগিয়ে নিতে ট্রুডো আলবার্টায় তেল উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্মিথ। আলবার্টার স্বাধীনতার দাবির প্রতি ট্রাম্পের মিত্রদেরও ধারাবাহিক আগ্রহ দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আলবার্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ বলে অভিহিত করেছেন। বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক ইলন মাস্ক চলতি মাসে এক্সে লিখেছেন, আলবার্টার ‘আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত’।
আলবার্টার স্বাধীনতাপন্থী নেতারাও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ও রিপাবলিকান দলের রাজনৈতিক কৌশলবিদদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বড় ধরনের অনিশ্চয়তা
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেই আলবার্টায় বেড়ে উঠেছেন। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রদেশটির সঙ্গে অটোয়ার সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
আলবার্টার বিটুমিন (একধরনের ঘন আঠালো তরল, যা মূলত অপরিশোধিত তেল থেকে পাওয়া যায়) বিদেশে আরও বেশি পরিমাণে রপ্তানির জন্য নতুন একটি পাইপলাইন নির্মাণ এগিয়ে নিতে তিনি স্মিথের সঙ্গে কাজ করছেন। ট্রুডোর আমলে এই প্রকল্পকে কার্যত অসম্ভব বলে মনে করা হতো।
কার্নি আলবার্টার বাসিন্দাদের সতর্ক করে বলেছেন, স্বাধীনতার পক্ষে একটি অবাধ্যতামূলক ভোটও হবে ‘বিপজ্জনক এক ভাঁওতাবাজি’। এ বিষয়ে তিনি ব্রেক্সিটের সময়ের নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তখন তিনি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর ছিলেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রেক্সিটের ভোটের পর যে ‘বিরাট অনিশ্চয়তা’ তৈরি হয়েছিল, তা ব্রিটিশ অর্থনীতির ক্ষতি করেছিল। অনিচ্ছাকৃত অর্থনৈতিক পরিণতির ব্যাপারে আলবার্টাকেও সতর্ক করেছেন তিনি।
কার্নির বক্তব্যকে ‘হুমকি’ বলে বর্ণনা করেছেন সিলভেস্টার।
সিলভেস্টার বলেন, প্রচারের শেষ দিনগুলোয় কার্নি আলবার্টাকে হুমকি দিয়েছেন। কার্নির বার্তা ছিল, ‘কানাডার বিপক্ষে ভোট দেওয়া বিপজ্জনক’। তাঁর এই বক্তব্য অত্যন্ত অযৌক্তিক।
এডমন্টনে ভোট দেওয়া ৪৪ বছর বয়সী হেইলি এরডেগার্ড এএফপিকে বলেন, ‘নিজেদের একটি দেশ গঠনের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের সহযোগিতার বিষয়ে আরও কিছু কাজ করা দরকার বলে আমি মনে করি।’
