ভারতের টেলিযোগাযোগ বিভাগ আগামী ১ নভেম্বর থেকে মোবাইল ফোনে কলারের নাম দেখানো ব্যবস্থা প্রবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে ফোনে কোনো নম্বর সংরক্ষিত না থাকলেও কল এলে সিম নিবন্ধনের সময় দেওয়া নাম মোবাইলের স্ক্রিনে দেখা যাবে। আর যদি পূর্ব থেকেই নম্বর সংরক্ষিত থাকে, তবে সেই নামই প্রদর্শিত হবে। বিদেশ থেকে আসা কলের ক্ষেত্রে নামের পরিবর্তে ‘ইন্টারন্যাশনাল কল’ লেখা দেখা যাবে। গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে কল শেষ হলে নাম সংক্রান্ত তথ্য মুছে ফেলার নিয়ম করা হয়েছে। আর যারা কলারের পরিচয় গোপন রাখার সেবা ব্যবহার করছেন, তাদের নাম প্রদর্শিত হবে না।
অর্থাৎ, ভারতে স্প্যাম বা ভুয়া কলের পরিচয় জানতে সাধারণ মানুষকে আর ট্রুকলারের মতো থার্ড পার্টি অ্যাপের ওপর নির্ভর করতে হবে না। বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্যও ডিজিটাল নিরাপত্তার মৌলিক সুবিধাগুলো কি টেলিকম সেবার মাধ্যমেই আরও সহজলভ্য করা সম্ভব নয়?
তাহলে কি সচেতনতারও বাজার আছে?
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে একধরনের অদৃশ্য বৈষম্য কাজ করে, তা আমাদের চারপাশে নজর দিলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অপরিচিত বা স্প্যাম কল থেকে নিজেদেরকে সতর্ক করতে আমরা অনেকেই ট্রুকলারের মতো থার্ড পার্টি অ্যাপ ব্যবহার করি। কিন্তু যে ব্যক্তি এই ধরনের অ্যাপ সম্পর্কে জানেন না কিংবা প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন নন, তিনি সেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকেন। আবার অ্যাপে কিছু বাড়তি সুবিধা ব্যবহারের জন্য অর্থও ব্যয় করতে হয়। ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার করাই নয়, বরং সেটা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানাশোনা, ব্যবহারের সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিষয়টাই এমন যেন—সচেতনতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মধ্যকার পার্থক্য নিরাপত্তার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি করছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা যেহেতু নাগরিকের মৌলিক সুবিধার পরিবর্তে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে—তবে কি সচেতনতারও একটা বাজার তৈরি হয়ে গেছে?
ব্যক্তির নিজের নিরাপত্তার পরিধি কিছুটা বাড়াতে বা বাড়তি সুবিধা পেতে যখন তাকে টাকা গুনতে হয়, তখন নিরাপত্তা আর সর্বজনীন অধিকার থাকে না; বরং তা পরিণত হয় একটা বাণিজ্যিক পণ্যে। তাহলে কি নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা কেবল তাদের জন্যই প্রযোজ্য, যারা প্রযুক্তি বুঝে নিজের দায়িত্বে সেগুলো খুঁজে নিতে পারেন এবং টাকা দিয়ে কিনতে পারেন?
নাকি টেলিকম অপারেটর, প্রযুক্তি-নির্ভর প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার নৈতিক দায় রয়েছে—যেন ব্যবহারকারীকে আলাদাভাবে কোনো অ্যাপ ইনস্টল বা অর্থ ব্যয় না করেই ডিজিটাল নিরাপত্তার মৌলিক সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়? এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত ভূমিকা কেমন হতে পারে? ডিজিটাল নিরাপত্তার মৌলিক সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দিতে সরকার ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কি কলারের পরিচয় শনাক্ত করার মতো সুবিধা টেলিকম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সব ব্যবহারকারীর জন্য সহজলভ্য করার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারে না?
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মিডিয়া লিটারেসির সম্পর্ক
ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম সাক্ষরতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্নে মিডিয়া লিটারেসি কী করতে পারে? এটা মূলত মানুষকে কোনো অচেনা ডিজিটাল পরিবেশে ব্যক্তির পরিচয় যাচাই, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার এবং অনলাইন ও ফোনকলের মাধ্যমে প্রতারণার কৌশল অনুধাবন করতে সাহায্য করে। তবে বাস্তবতা হলো, সবাইকে কেবল ‘সচেতন হতে হবে’ বলে দায়িত্ব শেষ করলেই কিন্তু সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হয় না। সচেতনতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাও সর্বস্তরের মানুষের জন্য সহজলভ্য হওয়া সমানভাবে প্রয়োজনীয়। সচেতনতা মানুষকে সংকট বুঝতে ও চিনতে শেখায়, কিন্তু কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যেন তারা সেই সংকটে সহজে না পড়েন।
ভারতের কলারের নাম প্রদর্শনের পদক্ষেপটা আসলে এ ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—সেটা হলো, ব্যবহারকারীকে সচেতন করার পাশাপাশি টেলিকম ব্যবস্থার মাধ্যমে কি নিরাপত্তার মৌলিক সুবিধা আরও সহজে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়?
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ
ভারতের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত সংবাদটি পড়ার পরপরই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু প্রশ্ন এসে যায়।
প্রথমত: বাংলাদেশেও কি অপরিচিত কলারের পরিচয় শনাক্ত করার সুবিধা ভিন্ন অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল না রেখে টেলিকম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সবার জন্য সহজলভ্য করা যায়?
দ্বিতীয়ত: ডিজিটাল নিরাপত্তার দায়িত্ব কতটা আসলে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর, আর কতটা সেবা প্রদানকারী টেলিকম অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার?
তৃতীয়ত: ডিজিটাল নিরাপত্তার মৌলিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টাই কি ব্যবহারকারীর সচেতনতা, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করা যথার্থ? নাকি নিরাপত্তার সুবিধা এমনভাবে সর্বজনীন করা উচিত, যেন তা পেতে প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে ভিন্ন ভিন্নভাবে অ্যাপ খুঁজতে, ইনস্টল করতে বা অর্থ ব্যয় করতে না হয়?
প্রযুক্তি ও অন্তর্জাল গণমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো এখন আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এজন্যই শুধুমাত্র ব্যক্তির সচেতনতার ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। বরং ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে নিরাপত্তার মৌলিক সুবিধাগুলো সবার জন্য সহজলভ্য করা এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা নিয়েও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জান্নাতুল রুহী: সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: jannatulruhi@gmail.com
